হাত পা কাঁপা কি পারকিনসন রোগের লক্ষণ? জানুন বিস্তারিত।

পারকিনসন ডিজিজ এক ধরনের স্নায়বিক রোগ। সবচেয়ে বেশি পরিচিত স্নায়বিক রোগ গুলোর মধ্যে এর অবস্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে। এই রোগটি কেন এবং কিভাবে বিকাশ লাভ করে জানা যাবে এই নিবন্ধে।

পারকিনসন ডিজিজ মূলত মস্তিষ্কের রোগ। এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে একটি মাত্র উপসর্গ দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ হিসেবে যেকোনো একটি হাতে কম্পন হতে পারে। রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে অন্যান্য উপসর্গ গুলো স্পষ্ট হতে থাকে। বিশেষ করে অস্পষ্টভাবে কথা বলা, হাঁটার সময় পায়ের সাথে সমানতালে হাত সামনে পিছনে করতে অসুবিধা এই রোগের অন্যতম লক্ষণ।

পারকিনসন রোগ কেন হয়

পারকিনসন রোগ কি এবং এই রোগের লক্ষণ কি?

এই রোগের কারণে মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ু কোষ  বা নিউরন ধীরে ধীরে মারা যায়। মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষগুলো থেকে তৈরি হয় ডোপামিন নামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ধরনের রাসায়নিক উপাদানের। ডোপামিনকে আমাদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজে। যেমন: হাঁটাচলা করতে, লিখতে, হাসি দিতে, কথা বলতে ইত্যাদি।

এই কাজগুলো করার সময় বিশেষ করে হাঁটাচলায় সহায়তা করতে আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বার্তা পাঠাতে ডোপামিনকে ব্যবহার করে। অর্থাৎ ডোপামিন মস্তিষ্কের বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করে।

মস্তিষ্কের নিউরনের ক্ষতির কারণে ডোপামিনের মাত্রা কমে যায়। যার ফলে পারকিনসন ডিজিজের উপসর্গ গুলি প্রকাশ পায়।

এই রোগের অনেক কারণ অজানা। তবে এখন পর্যন্ত যে কারণগুলোকে পারকিনসন রোগের জন্য দায়ী করা হয় সেগুলোর মধ্যে জেনেটিক কারণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পিতা মাতার যেকোনো একজনের অথবা উভয়ের পারকিনসন রোগের ইতিহাস থাকলে সন্তানের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জিনগত মিউটেশন এর কারণেও এই রোগ হতে পারে।

জেনেটিক কারণ ছাড়া অন্য কোন কারণে এই রোগ হলে সেটাকে ইডিওপ্যাথিক পারকিনসন ডিজিজ বলা হয়। অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের প্রভাব, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা কীটনাশকের সংস্পর্শ থাকা ও পূর্বে একাধিক স্ট্রোকের কারণে এই ডিজিজ হতে পারে।

পারকিনসন রোগের লক্ষণ

এই রোগের সবচেয়ে কমন উপসর্গ হলো হাতে বা পায়ে কম্পন অনুভূত হওয়া। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরের এক পাশের অঙ্গ গুলো প্রভাবিত হয়। রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে উভয় দিকের অঙ্গ গুলি প্রভাবিত হতে থাকে।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে তর্জনীকে ঘষতে দেখা যায়। চিকিৎসকরা এই বিষয়টাকে পিল-রোলিং কম্পন বলে। বিশ্রামের সময় হাতের কম্পন বৃদ্ধি পায় এবং কাজ করার সময় কমে যায়।

পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া পারকিনসন রোগের আরো একটি লক্ষণ। পেশি শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে হাঁটাচলা, ওঠা-বসা, গোসল, খাওয়া-দাওয়ার মত সাধারণ কাজগুলো করতে অস্বাভাবিক সময় লেগে যায়। এক কথায় এই রোগে আক্রান্ত রোগীর স্বাভাবিক মুভমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন মাসিক মিস হওয়ার কত দিন পর প্রেগন্যান্ট বোঝা যায়।

রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে আরো কিছু লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন: 

  • অস্পষ্ট কথা
  • ত্বকে সমস্যা
  • ডিপ্রেশন
  • সামনের দিকে নুয়ে পড়া
  • পায়ের সাথে সমান তালে হাত দুলিয়ে না চলতে পারে।

পারকিনসন রোগের জটিলতা

পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হলে কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন:
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ডিমেনশিয়া, বিষন্নতা, মানসিক পরিবর্তন ইত্যাদি মানসিক সমস্যা হতে পারে। সবসময় অজানা ভয় ও উদ্বেগ কাজ করে। রোগী কাজের অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলে।
 
খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রায়ই ঘুমের সমস্যা হয় এবং মুত্র নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য চলতে থাকে।
 
হঠাৎ রক্তচাপ কমে গিয়ে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন হতে পারে। অর্থাৎ রোগী বসা অবস্থা থেকে দাঁড়ালে মাথা ঘোরায় ও চোখে ঝাপসা দেখে। শরীরের কোন নির্দিষ্ট স্থানে অথবা সারা শরীরে ব্যথা এবং ক্লান্তিবোধ হতে পারে।

পারকিনসন রোগ প্রতিরোধের উপায়

এই রোগের সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি তাই এই রোগ প্রতিরোধের নির্দিষ্ট কোন উপায় নেই। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম করলে পারকিনসন রোগের ঝুঁকি কিছুটা কমে। চা-কফি ও অন্যান্য ক্যাফেইন যুক্ত খাবার এ রোগের ঝুকি বাড়ায়। তাই এই ধরনের খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে।
 
গ্রিন টি পারকিনসন ডিজিজ এর ঝুঁকি কমাতে পারে বলে অনেকে ধারণা করেন।

শেষ কথা

আমাদের দেশে স্নায়বিক রোগ গুলো বিষয়ে জানাশোনার অভাব রয়েছে। পারকিনসন রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। চিকিৎসক শুধু উপসর্গগুলো কমানোর জন্য ওষুধ সেবনে পরামর্শ দিয়ে থাকে।
 
মস্তিষ্কের এই জটিল রোগটি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। তাই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। পারকিনসন রোগের বিষয়ে আমরা যতটুকু জানি সেটা আপনাদের জানানোর চেষ্টা করেছি। রোগটি বিষয়ে আপনার কোন তথ্য জানা থাকলে সেটা কমেন্ট করে জানাতে পারেন, ধন্যবাদ।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *