স্থায়ী মোটা হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ টিপস।

রোগা পাতলা স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম। মোটা হতে কত কিছুই না করছেন। কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছেনা। আবার মোটা হওয়ার অনেক ঝুঁকিপূর্ণ উপায় রয়েছে। এসব উপায়ে মোটা হলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই মোটা হতে চাইলে নিরাপদ উপায় বেছে নিন।

আপনাকে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কতটুকু মোটা হতে চাইছেন। বিএমআই থেকে এই বিষয়ে জানা যায়। বয়স, উচ্চতা ও জেন্ডার অনুযায়ী বিএমআই ফলাফল পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো উপায় হল ধীরে ধীরে মোটা হওয়া। খুব দ্রুত মোটা হলে সেটা সচরাচর দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

মোটা হওয়ার উপায়

মাত্র সাত দিনে মোটা হওয়ার উপায়

খুব দ্রুত মোটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। প্রথমে আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে কতটুকু মোটা হতে চান। অর্থাৎ ৭ দিনে কতটুকু ওজন বাড়তে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে খাবার, ঘুম, ব্যায়াম, বিশ্রাম সবকিছু নিয়ে একটা রুটিন বানাতে হবে।

খাদ্য তালিকা বানাতে হবে উচ্চ ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার নিয়ে। বিশেষ করে বাদাম, শুকনো ফল, হাই ফ্যাট ডেইরি ফুড, মাংস এবং শেক জাতীয় খাবার ও ড্রিকস গুলো স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করে। মোটা হতে চাইলে শর্করা, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও আমিষ জাতীয় খাবার গুলো খাদ্য তালিকায় রাখতেই হবে। জেনে নিন মোটা হওয়ার খাবার সম্পর্কে।

কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার

কার্বোহাইড্রেট শরীরে শক্তি যোগায়। প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকে এমন খাবারের মধ্যে রয়েছে:

ভাত: ১০০ গ্রাম ব্রাউন রাইস ৭৬.২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে। ভাত উচ্চ কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গুলোর মধ্যে একটি। তাছাড়া বাদামি চালে প্রোটিনের পরিমাণ অন্যান্য চালের তুলনায় বেশি থাকে। ভাত থেকে অনেক ক্যালরি পাওয়া যায়। কেননা ১০০ গ্রাম ভাতে ৩৫৭ ক্যালরি রয়েছে।

সাদা ভাতে প্রোটিন কম থাকে। মোটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্যালরি ও প্রোটিন দুটোই প্রয়োজন। তাই সাদা ভাতের সাথে অন্যান্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন: মাছ-মাংস, ডাল, বাদাম বা মটরশুটি খেতে হবে।

হোল গ্রেইন ব্রেড: হোল গ্রেইন ব্রেড হল গোটা শস্যের আটা দিয়ে বানানো রুটি। এজাতীয় রুটিতে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন বেশি থাকে। সাধারণত সাদা আটার রুটিতে তেমন প্রোটিন থাকে না।

আরও পড়ুন জন্ডিস রোগ হলে কোন কোন খাবার খেতে হবে?

হোল গ্রেইন ব্রেড যদি ঘি বা মাখন এর সাথে খেলে প্রচুর ক্যালরি পাওয়া যায়। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য ব্রেকফাস্ট হতে হবে ঘি বা মাখন দিয়ে হোল গ্রেইন ব্রেড।

শুকনো ফল: ফ্রুক্টোজ এর সবচেয়ে বড় উৎস হল শুকনো ফল। যেমন: খেজুর, কিসমিস, শুকনো বরই ইত্যাদি। ফ্রুক্টোজ হল এক ধরনের ন্যাচারাল চিনি। শুকনো ফল প্রচুর ক্যালরি ধারণ করে। মোটা হতে যে অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন সেটা শুকনো ফল থেকে সহজেই পাবেন।

সাধারণত শুকনো ফল অন্যান্য খাবারের স্বাদ বাড়াতে বেশি ব্যবহৃত হয়। যেমন: মিষ্টি জাতীয় খাবারে কিসমিসের ব্যাবহার হয়। বরই দিয়ে বানানো হয় আচার। ক্লান্ত শরীর দ্রুত সতেজ করতে খেতে পারেন দু’চারটা শুকনো খেজুর।

অন্যান্য স্টার্চি খাবার: অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

  • আলু
  • পাস্তা
  • মিষ্টি আলু
  • স্কোয়াশ
  • ভুট্টা
  • শিম, ছোলা ও অন্যান্য ডাল

স্টার্চি খাবারে প্রচুর গ্লুকোজ থাকে যা গ্লাইকোজেন হিসাবে সঞ্চিত থাকে।

প্রোটিন জাতীয় খাবার

বেশি বেশি প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে যদি আপনি সঠিক উপায়ে মোটা হতে চান। প্রোটিন শরীরে মাংস পেশি গঠন করে।

ডিম: প্রোটিন ও হেলদি ফ্যাট দুটোই পাবেন ডিমে। ডিমের সাদা অংশে থাকে অ্যালবুমিন প্রোটিন যা সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। ডিমের কুসুমে ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। তাছাড়া ডিমের কুসুমে কোলিন নামের এক ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। এই কোলিন আমাদের মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

মাছ: আসলে আমাদের প্রোটিনের চাহিদার বেশিরভাগ পূরণ করে মাছ। সামুদ্রিক হোক আর মিঠা পানির হোক সব মাছে প্রোটিন থাকে। তবে সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা মস্তিষ্ক ও চোখের সুস্থতার জন্য দরকার। যাই হোক, মিঠাপানির মাছ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট।

মাংস: মাছ ও ডিমের পাশাপাশি প্রোটিনের জন্য মাংস খেতে হয়। মোটা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাট ও প্রোটিনের যোগান দিবে মাংস। গরুর মাংস, মুরগির মাংস, টার্কি মুরগির মাংস, হাঁসের মাংসের যেকোনো একটি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য মাংসের তুলনায় গরুর মাংসে ফ্যাট একটু বেশি। তাই অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে আবার শরীরে চর্বি জমতে পারে।

প্রোটিন শেক: মাছ, মাংস ও ডিম বা অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে যাদের অনিহা তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান প্রোটিন শেক। বাজারে মিল্ক বেসড ও সয়া বেসড এই দুই ধরনের প্রোটিন শেক পাওয়া যায়। অনেকে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স এর কারণে গরুর দুধ খেতে পারে না। তাদের জন্য বেস্ট হল সয়া বেসড প্রোটিন শেক।

ডেইরি ফুড: দুগ্ধ জাত খাবার খেতে হবে কেননা এগুলো প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি দিবে। ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের মত খুবই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাবেন ডেইরি ফুড থেকে। দ্রুত মোটা হতে হলে দুধ, দই, বাদামের মাখন ইত্যাদি ডেইরি ফুড নিয়মিত খেতে হবে।

বাদাম ও বীজ: বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবারের প্রচুর অসম্পৃক্ত ফ্যাট থাকে। উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিনের ভালো উৎস হল বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার গুলো।

কাজু, পেস্তা বাদাম, চিনা বাদাম, মসুর ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ইত্যাদি বীজ জাতীয় খাবার গুলো খেলে আমাদের শরীর প্রচুর প্রোটিন পাবে।

মোট স্বাস্থ্যের সহায়ক ডায়েট

কোন বেলায় কি ধরনের খাবার খাবেন এই ব্যাপারে ধারণা দেয়া হলো।

সকালের নাস্তা

সকালের নাস্তায় রাখতে পারেন ডিম, দুধ, কলা ও কিছু শুকনো ফল। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে এই খাবারগুলোতে। আমাদের শরীরের জন্য যেসব পুষ্টি উপাদান বেশি দরকার তার মধ্যে অনেকগুলোই দুধে পাবেন।

বিশেষ করে দুধের ক্যালসিয়াম আমাদের হাড় মজবুত করে এবং ভিটামিন বি ১২ রক্ত তৈরিতে সহায়তা করে। তাই সকালের নাস্তায় ১ গ্লাস দুধ রাখা উচিত।

ডিম হল একটি ন্যাচারাল মাল্টিভিটামিন। এতে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন রয়েছে। কলা একটি সহজলভ্য ফল। কলায় রয়েছে ভিটামিন বি ৬ যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আর খেজুর আপনার ক্যালরি বাড়াবে। খেজুর অনেক পুষ্টি দিয়ে ভরপুর। খেজুর ও কলাতে যে ফাইবার থাকে তা হার্ট ভালো রাখতে এবং হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। সব সময় সেদ্ধ ডিম খাওয়ার চেষ্টা করবেন। অস্বাস্থ্যকর তেল দিয়ে ভাজা ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

দুপুরের খাবার

দুপুরে প্রোটিনযুক্ত খাবারের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। টার্কি মুরগি বা দেশী মুরগীর মাংস ডিম খেতে পারেন দুপুরে। গরুর মাংস বা খাসির মাংস খেতে পারেন দুপুরে। তবে গরুর মাংস বা খাসির মাংসে অনেক ফ্যাট থাকে যা বেশি পরিমাণে নিয়মিত খেলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। মুরগির মাংসে সেরকম কোন ঝুঁকি নেই।

তবে সবচেয়ে ভালো মসুর ডাল। মসুর ডাল সহজেই পাওয়া যায়। খাসির মাংস বা গরুর মাংস খেলে যে প্রোটিন পাওয়া যায় সেটা মসুর ডাল থেকেও পাওয়া যায়। মসুর ডালের বাড়তি সুবিধা হল এতে কোন ক্ষতিকর ফ্যাট নেই। আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামের মত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি থাকে মসুর ডালে।

শরীরে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এর ঘাটতি হলে খাবারে প্রতি অরুচি আসতে পারে। খাবারের প্রতি অরুচি থাকলে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই শুকনো রোগা থাকবে। তাই যেকোনো শাকসবজি দুপুরের খাবার তালিকায় রাখা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

দুপুরে খাবারের পর এক বাটি টক দই খেলে বেশ উপকার হবে। ক্যালসিয়াম ভিটামিন ছাড়াও টক দইয়ের বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। টক দইয়ে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। হজম শক্তি বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি সহ নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহায্য করে এই ব্যাকটেরিয়া গুলো।

রাতের খাবার

রাতের খাবার অনেকটা দুপুরের খাবারের মতো। ডিম, মাছ, মাংস ও শাকসবজি আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী খেতে পারেন। দুপুরে যদি ভিটামিন ও প্রোটিনযুক্ত খাবারগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে না পারেন তাহলে রাতের খাবারের সাথে যোগ করে নিতে পারেন।

অন্যান্য খাবার

সকাল ও দুপুরে খাবারের মাঝামাঝি সময়ে অল্প করে কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ভালো। একইভাবে দুপুর ও রাতের খাবারের মাঝামাঝি সময়ে কিছু খেয়ে নিতে পারেন। বাদামে প্রচুর পরিমাণে হেলদি ফ্যাট, ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেল থাকে।

আপনি আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী যে কোন ধরনের বাদাম খেতে পারেন। চিনা বাদাম, কাজু, কাঠবাদাম বা পেস্তা বাদাম আপনার যা খুশি। চাইলে বাদামের সাথে বীজ জাতীয় খাবার গুলো খেতে পারেন। যেমন: তিলের বীজ, তিসি বীজ, কুমড়ার বীজ, চিয়া সিড ইত্যাদি। আসলে সব ধরনের বীজ জাতীয় খাবারে প্রচুর পুষ্টি থাকে।

মোটা হওয়ার অন্যান্য টিপস

নিচের টিপসগুলো রোগা পাতলা স্বাস্থ্যের মানুষদের মোটা হতে সাহায্য করবে।

ব্যায়াম

ব্যায়াম করলে শরীর থেকে ক্যালরি বার্ন হয়। তাই অনেকেই মনে করেন ব্যায়াম করলে বোধ হয় স্বাস্থ্য মোটা হয় না। অতিরিক্ত ক্যালরি খাওয়ার ফলে শরীরে ফ্যাট জমতে পারে। তাই কিছু ক্যালরি বার্ন করতে হবে। ওজন বাড়াতে চাইলেও ব্যায়াম করা প্রয়োজন।

ব্যায়াম ওয়েট গেইন করার একটা স্বাস্থ্যকর উপায়। ব্যায়াম করার জন্য আপনি জিমে যেতে পারেন অথবা অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে শিখে বাড়িতেও করতে পারেন।

পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুমের অভাব দুর্বল স্বাস্থ্যের একটি কারণ। তাই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে ও ভালো রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। আপনি যদি মোটা হতে চান তাহলে পুষ্টিকর খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি প্রতিদিন কমপক্ষে আট থেকে নয় ঘন্টার মত ঘুমাতে হবে। রাতে ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকুন। বিশেষ করে অধিক রাত পর্যন্ত মোবাইল, টিভি, কম্পিউটারের ব্যবহার ইত্যাদি।

শেষ কথা: এই পোস্ট এর কোন অংশ বুঝতে কোন অসুবিধা হলে আমাদের জানাবেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *