হিমোগ্লোবিন বাড়াতে খেতে হবে যে সকল খাবার।

হিমোগ্লোবিন হলো আমাদের লোহিত রক্ত কণিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এর অভাবে শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। হিমোগ্লোবিনের অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। ডাক্তারি ভাষায় যাকে অ্যানিমিয়া বলা হয়। সুস্থ থাকতে হলে রক্তে এর পরিমাণ স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে হবে।

স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে, হিমোগ্লোবিন কম হওয়ার কারণ কি? এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমিষ, ফলিক এসিড ও আয়রন সমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে না খাওয়ার ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। অর্থাৎ আয়রন ও ফলিক এসিডের অভাবের কারণে রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যায়।

রক্তস্বল্পতা রোধে বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য আয়রন ও ফলিক এসিড যুক্ত খাবার গুলো খেতে হবে। এজন্য প্রথমে জানতে হবে কোন খাবারগুলোতে আয়রন ও ফলিক এসিড বেশি থাকে।

হিমোগ্লোবিন কি?

হিমোগ্লোবিন বাড়ে কোন খাবারে।
আমরা যখন অক্সিজেন গ্রহণ করি সেটা ফুসফুস থেকে কোষকলা পর্যন্ত পৌঁছে দেয় হিমোগ্লোবিন। যা আমাদের লোহিত রক্ত কণিকার থাকা একটি প্রয়োজনীয় প্রোটিন। এই প্রোটিনের কারণে (Red Blood Cell) RBC বা  লোহিত রক্তকণিকা লাল রঙের হয়।
 
আমাদের দেহে হিমোগ্লোবিনের একটা নরমাল রেঞ্জ রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কমে গেলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা হল পুরুষদের ক্ষেত্রে রক্তের প্রতি ডেসিলিটারে ১৩.৫ গ্রাম বা মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রতি ডেসিলিটারে ১২ গ্রাম। যদি কোনো কারণে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এর চেয়ে কমে যায় সেটাকে রক্তস্বল্পতা বলে।

হিমোগ্লোবিন কম হওয়ার কারণ

বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন:
  • গর্ভাবস্থা
  • লিভারে সমস্যা
  • মূত্রনালীর সংক্রমণ
  • আয়রনের অভাব জনিত রক্তস্বল্পতা
কিছু মানুষের কোনো অন্তর্নিহিত কারণ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম থাকে। অনেকের শরীরে হিমোগ্লোবিন কাউন্ট কম হলেও তেমন কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যায় না।

হিমোগ্লোবিন কমে গেলে করনীয়

রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম হলে পুনরায় স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কি কারণে রক্তস্বল্পতা হয়েছে সেটার কারণ খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শরীরে আয়রন ও ফোলেট এর অভাব এর জন্য দায়ী।
 

আরও পড়ুন আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা।রক্তস্বল্পতা দূর করে যে সব খাবার।

হিমোগ্লোবিন মূলত লোহিত রক্তকণিকায় থাকে। আয়রন নামক এক খনিজ পদার্থ এই পদার্থ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্রান্সফারিন নামক একটি প্রোটিন আয়রনের সাথে যুক্ত হয়ে লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদনে সাহায্য করে। এই লোহিত রক্তকণিকায় বা রেড ব্লাড সেলের মধ্যেই হিমোগ্লোবিন নামক পদার্থটি থাকে।
 
ইহা বাড়ানোর একমাত্র উপায় হল আয়রন সমৃদ্ধ খাবারগুলো বেশি বেশি খাওয়া। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে:
  • কলিজা
  • শেলফিশ
  • গরুর মাংস
  • শাক সবজি 
  • সবুজ মটরশুটি
  • বাঁধাকপি
  • মটরশুটি এবং মসুর ডাল ইত্যাদি।
ফোলেট বা ভিটামিন বি ১২ এর ঘাটতি হলেও রক্তে এর মাত্রা কমে যেতে পারে। ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে যদি রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় তাহলে তাকে ভিটামিন বি ১২ এর অভাব জনিত রক্তস্বল্পতা বলে। তাই রক্তে এই উপাদানটির মাত্রা বাড়াতে ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাবার গুলো খেতে হবে।
  • কলা 
  • পেঁপে
  • চিনা বাদাম
  • শালগম  ও সবুজ শাকসবজি
  • কমলা, টমেটো, গরুর কলিজা, মটরশুটি ইত্যাদি।

হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধির ঔষধ

আয়রন ট্যাবলেট একটি OTC ড্রাগ। যদি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুব বেশি কমে যায় অর্থাৎ যদি মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় তাহলে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পাশাপাশি আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। কেননা অতিরিক্ত আয়রন ত্বকের নিচে জমা হয়ে হেমোক্রোমাটোসিস হতে পারে।
 
আয়রন সাপ্লিমেন্ট এর ওভারডোজ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে আয়রন সাপ্লিমেন্ট খেতে
হয়। আয়রন সাপ্লিমেন্ট শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।

সর্বোচ্চ আয়রন শোষণ

খাবার হতে সর্বোচ্চ আয়রন শোষণের মাধ্যমে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ানো যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে ভিটামিন সি আয়রন শোষণ বৃদ্ধি করে। তাই আয়রন যুক্ত খাবারের সাথে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে খাবার হতে আয়রন সর্বোচ্চ শোষিত হবে।
 
চা এবং কফি আয়রন শোষণ ক্ষমতা কমায়। তাই অত্যাধিক চা ও কফি পান করার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। 
 
শস্যজাতীয় খাবারগুলোকে ভিজিয়ে রেখে খেলে আয়রন শোষণ বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া লাইসিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো আয়রন শোষণ বৃদ্ধি করতে পারে। 

হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ানোর খাবার

নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন ও ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাবারগুলো খেলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকবে। যাদের রক্তে এর মাত্রা কমে গেছে অবশ্যই তাদের প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাবারগুলো খেতে হবে। আমরা আপনাদের জন্য এখানে এমন কতগুলো খাবারে তালিকা তৈরি করেছি যেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে।
 
খাবার হতে যে আয়রন পাওয়া যায় তাদেরকে হিম ও নন-হিম এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্য থেকে যে আয়রন পাওয়া যায় সেটা হল নন-হিম আর প্রাণী জাতীয় খাদ্য থাকে যে আয়রন পাওয়া যায় সেটা হল হিম আয়রন। 
 
পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১৮ গ্রাম আয়রন প্রয়োজন। তবে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন অথবা গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন ৯ থেকে ২৭ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন। কিশোর কিশোরীদের তাদের বয়স অনুযায়ী আয়রন নিতে হবে। 

১.আয়রন সমৃদ্ধ দানাদার খাদ্য

আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গুলোর মধ্যে বীজ বা দানা জাতীয় খাবার ও বাদাম অন্যতম। এগুলোতে প্রচুর পরিমানের নন-হিম আয়রন রয়েছে। যদি রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়াতে চান তাহলে নিচের খাবারগুলো প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা রাখতে পারেন।

১.বাদাম ও বীজ

১ কাপ বাদামে প্রায় ৫.৩ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে
কাজু বাদামে আয়রন থাকে প্রায় ৭.৮ মিলিগ্রাম
কুমড়োর বীজে প্রায় ১১.৪ মিলিগ্রাম
এবং তিলের বীজে ২১ মিলিগ্রাম।

২.ডাল জাতীয় খাবার

আয়রনের ঘাটতি পূরণ করতে পারে ডাল জাতীয় খাবারগুলো। শিম, মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ছোলা ইত্যাদি ডাল জাতীয় খাবার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন পাবেন। 
 
১ কাপ রান্না করা ছোলায় আয়রন থাকে প্রায় ৪.৭ মিলিগ্রাম।
কাঁচা সয়াবিনে আয়রন থাকে প্রায় ৯.৯ মিলিগ্রাম
মসুর ডালে আয়রন পাবেন ৬.৬ মিলিগ্রাম
সাদা মটরশুঁটিতে ৬.৬ মিলিগ্রাম।

আয়রন সমৃদ্ধ ফল 

আসলে ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন থাকে না। কিন্তু ফলে থাকা ভিটামিন সি সর্বোচ্চ পরিমাণে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। খাবার থেকে ভালোভাবে আয়রন শোষণের জন্য প্রয়োজন ভিটামিন সি। সাইট্রাস ফল গুলোতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। তাই আয়রন যুক্ত খাবারের পাশাপাশি সাইট্রাস ফল খেলে আয়রন ভালোভাবে শোষিত হবে। 
 
কমলা, লেবু, জাম্বুরা, আম, পেয়ারা, স্ট্রবেরি তরমুজ ইত্যাদি ফল নিয়মিত খেলে আয়রন যুক্ত খাবার গুলো থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন পাওয়া যাবে।

মাংস ও ডিম 

মাংস ও ডিম হলো প্রাণিজ আয়রনের একটি ভালো উৎস। মাংস ও ডিমে আমাদের দেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান প্রোটিন থাকে। মাংস ও ডিম খেলে প্রোটিনের পাশাপাশি রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়বে। গরুর মাংস, খাসির মাংস, মুরগির মাংস, কলিজা খেলে আয়রনের ঘাটতি পূরণ হবে। 
 
ডিম বহু পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি খাবার। ডিমের কুসুমে প্রচুর পরিমাণে আয়রন এবং ফলিক এসিড থাকে। দ্রুত শরীরের দুর্বলতা দূর করতে খেতে পারেন একটি সিদ্ধ ডিম। 

শস্য খাবার

চাল, গম ও বার্লির মত শস্য জাতীয় খাবারেও আয়রন থাকে। নিয়মিত লাল চালের ভাত ও গমের রুটি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করতে পারে। শস্য জাতীয় খাবারগুলো খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকবে। তবে সাদা আটা ও সাদা চালে খুবই অল্প পরিমাণে আয়রন থাকে। তাই আমাদের সাদা আটা ও সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল ও লাল আটা খেতে হবে। 

হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যা হয়

হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। রক্তস্বল্পতাকে মাইল্ড, মোডারেট ও সিভিয়ার এই তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। সামান্য রক্তস্বল্পতা ও মধ্যম পর্যায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন ও ফোলেট সমৃদ্ধ খাবার ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়। মারাত্মক অথবা সিভিয়ার রক্তস্বল্পতা হলে ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর প্রয়োজন হতে পারে।
 
অ্যানিমিয়া হলে সাধারণত যে সকল লক্ষণ ও চিহ্ন গুলো প্রকাশ পায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
 
  • রক্তস্বল্পতায় হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়া ফ্যাকাসে দেখায় 
  • চোখের পাতার ভেতর দিক ফ্যাকাসে দেখায় এবং ঠোঁট ও জিহ্বা ফ্যাকাসে দেখায় 
  • হাতের তালু এবং নখ ফ্যাকাসে দেখাবে
  • রক্তের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ফলে শরীরে পানি দেখা দিতে পারে 
  • তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে হার্টের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয় অর্থাৎ হার্ট ফেইলিউর হতে পারে 
  • হিমোগ্লোবিনের অভাবে রক্তের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমে যায়। রক্তের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস ও পালস স্বাভাবিক চেয়ে বেশি হবে 
  • অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, বুক ধড়ফড় করা এবং মাথা ঘুরাতে পারে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *