ইউরিন ইনফেকশন হলে কি করা উচিত।

ইউরিন ইনফেকশন বা প্রস্রাবে সংক্রমণ কথাটি আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত। ডাক্তারি ভাষায় এই রোগের নাম ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন, সংক্ষেপে ইউটিআই (UTI)। এটি কেন হয়, লক্ষণ ও উপসর্গ এবং প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় জানা গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষের চেয়ে মহিলাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একটু বেশি। এর অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে বিশেষ করে পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং প্রস্রাব চেপে রাখা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া ইউরিন ইনফেকশন ঘটায়, তবে অন্য জীবাণুর সংক্রমনের কারণেও হতে পারে।

ডাক্তারের নির্দেশমতো ওষুধ খেলে এবং কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে খুব সহজেই এই রোগ সেরে যায়। তবে দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে অর্থাৎ সময়মত ডাক্তারের কাছে না গেলে ইনফেকশন প্রথমে কিডনিতে এবং পরবর্তীতে রক্তে ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই ইউরিন ইনফেকশন এর জটিলতা প্রতিরোধে দ্রুত একজন ডাক্তার দেখানো উচিত।

ইউরিন ইনফেকশন কি?

ইউরিন ইনফেকশন হলে কি করা উচিত

আমাদের দেহের যে অঙ্গগুলো প্রস্রাব তৈরি করে, বহন করে ও শরীর থেকে বের হতে সাহায্য করে তাদের একসাথে ইউরিনারি ট্রাক্ট বলে। দুটি কিডনি, দুটি ইউরেটার, একটি ব্লাডার ও একটি ইউরেথ্রা নিয়ে ইউরিনারি ট্রাক্ট গঠিত হয়। কিডনি ইউরিন বা প্রস্রাব তৈরি করে, এই ইউরিন ইউরেটার এর মধ্য দিয়ে ব্লাডারে জমা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রস্রাব না করা হয় সেটা ব্লাডার বা মূত্রাশয়ে জমা থাকে।

ইউরিন ইনফেকশন বলতে ইউরিনারি ট্রাক্ট এর কোথাও ইনফেকশন হওয়াকে বোঝায়। ইউরিন ইনফেকশন এর ডাক্তারি ভাষা হলো ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন বা সংক্ষেপে ইউটিআই।

ইনফেকশন কিডনিতে হলে তাকে বলে পাইলোনেফ্রাইটিস, ইউরেথ্রা বা প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশন হলে ইউরেথ্রাইটিস এবং ব্লাডার বা মূত্রাশয়ে ইনফেকশন হলে তাকে বলা হয় সিস্টাইটিস। এই সবগুলোই হলো ইউরিন ইনফেকশন।

ইউরিন ইনফেকশনের কারণ

ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীর মধ্য দিয়ে মূত্রাশয় বা মূত্র থলিতে প্রবেশ করে ইনফেকশন ঘটায়। এই ইনফেকশন পরবর্তীতে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাকটেরিয়ার মূত্রথলিতে প্রবেশের মাধ্যমেই ইউরিন ইনফেকশন শুরু হয়। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া মূত্রথলিতে প্রবেশের আগেই আমাদের শরীর তাকে ফ্লাশ আউট করে যার কারণে ইনফেকশন হয় না। কোন কারনে এই প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হলে ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে।

সাধারণত যে ব্যাকটেরিয়া গুলো ইউরিন ইনফেকশন ঘটায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ই-কোলাই
  • প্রোটাস মিরাবিলিস
  • স্ট্যাফাইলোকক্কাস স্যাপ্রোফাইটিকাস
  • ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া
  • এন্টেরোকক্কাস ফেকালিস

যে কোন ব্যক্তিই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে কিছু কিছু কারণ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়। যেমন:

  • প্রস্রাব চেপে রাখা
  • কিডনিতে পাথর বা টিউমার
  • ক্যাথেটার ব্যবহার করার পর
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করা
  • ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি আরো বেশি।
  • দুর্বল স্বাস্থ্যবিধির কারণেও হতে পারে।
  • একবার প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে এবং ভালোভাবে তার চিকিৎসা না করা হলে পরবর্তীতে আবার হতে পারে।
  • ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে যে কারণে ইউরিন ইনফেকশন এর ঝুঁকি থাকে।

মহিলাদের মধ্যে ইউরিন ইনফেকশন সমস্যা বেশি দেখা যায়। এর অবশ্য নানা কারণ রয়েছে। পর্যাপ্ত পানি পান না করা ও প্রস্রাব চেপে রাখা সেগুলোর মধ্যে একটি কারণ। বিশেষ করে মহিলারা যখন ঘরের বাইরে ও কর্মক্ষেত্রে যায় প্রস্রাবের ভয়ে খুব বেশি পানি পান করে না। যা তাদের ইউনিয়ন ইনফেকশনের একটি কারণ। তাছাড়া তাদের ইউরেথ্রা এর অ্যানাটমিক্যাল গঠন ইউরিন ইনফেকশনের একটি অন্যতম কারন।

ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ

সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:

  • হঠাৎ করে ঘন ঘন প্রস্রাব শুরু হয়
  • প্রস্রাব করার সময় অস্বস্তি, প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া
  • সাথে জ্বর ও তলপেটে ব্যথা থাকতে পারে
  • ঘোলাটে রঙের তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব
  • অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে রক্ত থাকতে পারে
  • একটু পরপর প্রস্রাব পায় এবং প্রস্রাব করার পরেও মনে হয় প্রস্রাব শেষ হয়নি আর একটু প্রস্রাব করা যাবে।

ইনফেকশন কিডনিতে হলে পিঠের নিচের দিকে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। শরীর দুর্বল হয়, অস্বস্তি লাগে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়।

ইউরিন ইনফেকশন হলে কি করা উচিত

যেহেতু এটি একটি ইনফেকশন জনিত রোগ তাই ডাক্তার দেখানোই এর একমাত্র সমাধান। ডাক্তারের নির্দেশ মতো ওষুধ খেতে হবে ওষুধের কোর্স সম্পূর্ণ কমপ্লিট করতে হবে। সাধারণত ডাক্তাররা ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন করে। কোন এন্টিবায়োটিক খাবেন ও কতদিন খেতে হবে এসব বিষয়ে শুধু একজন ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিতে পারবে।

আরো পড়ুন বাচ্চাদের আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত।

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ খাবেন না। এতে আপনার উপকারের চেয়ে বেশি উপকার হবে। ওষুধের কোর্স কমপ্লিট করার পর ফলো আপের জন্য পুনরায় ডাক্তারের কাছে যেতে হতে পারে। এই রোগটি নিয়ে কখনো অবহেলা করা উচিত হবে না। কিডনি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিডনি ইনফেকশন হলে কিডনি ড্যামেজ হয়ে যাওয়া সহ নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ইউরিন ইনফেকশন হতে সুস্থ হতে একজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে সময় মত সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে বা ঘরোয়া উপায়ে ইনফেকশন প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইউরিন ইনফেকশনের ঘরোয়া প্রতিকার

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। যেমন: ফলের রস, ডাবের পানি, স্যুপ ইত্যাদি। শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর করতে হাইড্রেট থাকা জরুরি। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের প্রতিদিন কমপক্ষে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করার নিয়ম রয়েছে।

প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না। ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। যেমন: শাকসবজি, ফল-মূল, দুধ, ডিম, মাছ ইত্যাদি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যেমন: প্রতিদিন গোসল করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, মলত্যাগের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। ব্যবহারের পর আন্ডারওয়্যার ভালো ভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *