টিবি রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়।

টিবি একটি মারাত্মক রোগ হলেও বর্তমানে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। আমাদের দেশে আগে একটা কথা ছিল যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই। সে সময়ে যক্ষ্মার কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা ছিল না। তাই সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই রোগে মৃত্যুর হার ছিল অনেক।

জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ও অ্যান্টিবায়োটিকের বিকাশ লাভ করার ফলে এই রোগে মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে যক্ষ্মা আবার চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়ার ফলে এই রোগের কিছু স্ট্রেন কার্যকর চিকিৎসাতেও সাড়া দেয় না। তাই আমাদের এই রোগটি ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

টিবি রোগ প্রতিরোধে ও প্রতিকারে আমাদের সচেতনতা জরুরি। মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে টিবি রোগ হয়। এই ব্যাকটেরিয়া মারাত্মকভাবে ফুসফুসকে সংক্রমিত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতা থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে।

টিবি রোগের লক্ষণ

টিবি রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়

সুপ্ত অবস্থায় এই রোগের কোন লক্ষণ ও উপসর্গ থাকে না। অর্থাৎ রোগী টিবি রোগে আক্রান্ত কিন্তু কোন উপসর্গ দেখা যায় না। এমনকি এক্সরে পরীক্ষা করলেও বুকে কোন চিহ্ন দেখা যায় না। তবে এই সময়ে রক্ত পরীক্ষা করে রোগটি শনাক্ত করা যায়। টিবি রোগের এই পর্যায়কে সুপ্ত টিবি বলে।

উপসর্গগুলো সক্রিয় টিবি রোগে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে দেখা যায়। রোগীর অবিরাম কাশি থাকে। চিকিৎসকদের মতে একটানা ৩ সপ্তাহ বা ২১ দিনের বেশি কাশি থাকলে কফ পরীক্ষা করা উচিত। একটানা ৩ সপ্তাহের বেশি কফ কাশি, বুকে ব্যথা ও জ্বর এই রোগের প্রধান লক্ষণ।

সাধারণত টিবি হলে যে সকল লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়:

  • এক নাগাড়ে ৩ সপ্তাহের বেশি কফ কাশি
  • অনেক সময় কফের সাথে রক্ত আসে
  • শরীর ক্লান্ত লাগে, কোন কিছু খেতে ইচ্ছে করে না
  • বুকে ব্যথা হয়
  • জ্বর ও রাতে প্রচন্ড ঘাম হয়

ফুসফুস মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে ফুসফুসে পানি জমে। তখন রোগীর উপসর্গ গুলো আরও জটিল হয়। সময়মত সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগটি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

এমন অবস্থায় হার্ট ফেইলিউর বা সেপসিস এর কারণে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই এই রোগের প্রাণঘাতী রূপ দেখার আগে জরুরী ভিত্তিতে একজন ডাক্তার দেখানোর বিকল্প নেই।

টিবি রোগ কেন হয়?

মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস ব্যাকটেরিয়া টিবি রোগের কারণ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি কাশি দিলে, কথা বললে, থুথু ফেললে বা হাসলে ব্যাকটেরিয়া গুলি বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সুস্থ ব্যক্তির দেহে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। এভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তি টিবি রোগে আক্রান্ত হয়। শুধুমাত্র সক্রিয় টিবি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই এই রোগ ছড়ায়। সুপ্ত টিবি রোগে আক্রান্ত রোগীদের রোগ ছড়ানোর ব্যাপারে কোন ভূমিকা থাকে না।

টিবি রোগের প্রতিকার

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাংলাদেশে টিবি রোগের চিকিৎসা করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বক্ষব্যাধি ক্লিনিক এবং কিছু এনজিও ক্লিনিকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এই প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিনামূল্যে কফ পরীক্ষাও করা হয়। তাই অবিরাম তিন সপ্তাহের বেশি কাশি থাকলে কফ পরীক্ষা করে নিন এই ক্লিনিক গুলো থেকে।

আরো পড়ুন ২ মাসের গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা।

চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক প্রতিদিন নিয়ম মেনে ওষুধের কোর্স সম্পন্ন করলে টিবি রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। অনিয়মিত ও অসমাপ্ত ওষুধের কোর্স এই রোগের জটিলতা বাড়ায়। তাই অবহেলা নয় রোগীর উচিত ওষুধের কোর্স সম্পন্ন করা।

টিবি রোগ প্রতিরোধে উপায়

প্রতিরোধে দুটো উপায় রয়েছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে এবং সংক্রমনের বিস্তার ঠেকিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তিদের দেহে এই রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম তিন সপ্তাহ নিয়মিত ওষুধ খেলে সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকি থাকেন না।

১.টিবি রোগের রোগের বিস্তার রোধ

  • হাঁচি কাশির সময় বা নাক পরিষ্কার করতে টিস্যু পেপার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
  • ব্যবহৃত টিস্যু যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না, ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।
  • রোগীর মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, মাস্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না।
  • বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঘনিষ্ঠতা পরিহার করুন।
  • নিয়মিত ওষুধ সেবন ও ওষুধের কোর্স কমপ্লিট করতে হবে।
  • যেখানে সেখানে থুথু ফেলা যাবে না।

২.টিবি রোগের ভ্যাকসিন

আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচিতে টিবি রোগের ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের জন্য বিনামূল্যে এই টিকা সরবরাহ করা হয়। এই টিকার নাম ব্যাসিলাস ক্যালমেট গুয়েরিন বা বিসিজি টিকা।

এই টিকা শিশুর মস্তিষ্ক ও হাড়ের টিবি রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরেও ফুসফুসে টিবি রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ভ্যাকসিন দিলে এই রোগ হবেনা এমন ধারনা ভুল।

শিশুর জন্মের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে বিসিজি টিকা দিতে হয়। কোন কারনে এ সময়ের মধ্যে টিকা দিতে না পারলে পরবর্তীতে দিতে পারবেন। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বিসিজি টিকা দেওয়া যায়।

টিবি রোগের ঝুঁকি যাদের বেশি

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় অন্যান্য কিছু রোগের কারণে। যেমন: এইচআইভি বা এইডস ও ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে তাই তাদের টিবি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ধূমপান বা তামাক সেবনে টিবি রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় আরো অনেক কারণ রয়েছে। যেমন:

  • বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন কম হলে।
  • সিলিকোসিস
  • সিভিয়ার কিডনি ডিজিজ
  • হেড ও নেক ক্যান্সার
  • পুষ্টির অভাব বা অপুষ্টি জনিত রোগ
  • মদ্যপান

যে অঞ্চলে এই রোগের বিস্তার বেশি সেখানে বসবাসরত বা ভ্রমণকারী ব্যক্তিদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সময়মতো ভ্যাকসিন না নিলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিছু সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

টিবি রোগ কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ টিবি একটি বায়ুবাহিত ছোঁয়াচে রোগ।মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামের ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে এই রোগ হয়। আক্রান্ত রোগীর হাঁচি কাশি, কথা বলার সময় বা হাসলে এই ব্যাকটেরিয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। যা কোন সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করলে সে আক্রান্ত হয়।

টিবি রোগ কত প্রকার?
জীবাণুটি শরীরের কোন অংশে সংক্রমণ ঘটিয়েছে সেটার উপর ভিত্তি করে এই রোগটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ফুসফুসে সংক্রমণ হলে তাকে ফুসফুসীয় টিবি। ফুসফুসের বাইরে সংক্রমণ হলে তাকে ফুসফুস বহির্ভূত টিবি বলে।

টিবি রোগ কত দিনে ভালো হয়?
একটানা ৬ মাস ওষুধ খেলে টিবি রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা ওষুধ প্রতিরোধী টিবি রোগীদের ৯ মাস ব্যাপী ওষুধ সেবন করতে হতে পারে যদি ডাক্তার পরামর্শ দেয়।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *