ইউরিক এসিড কমাবে যে তিন খাবার। ইউরিক এসিডে নিষিদ্ধ খাবার।

বর্তমান সময়ে শরীরে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার সমস্যাটি দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে কিছু নির্দিষ্ট খাবার রয়েছে যেগুলো বেশি বেশি খেলে ইউরিক এসিড বেড়ে যায়। ইউরিক এসিড বৃদ্ধির অন্যান্য কারণের মধ্যে জেনেটিক কারণ অন্যতম।

বিভিন্ন ধরনের খাবারে পিউরিন নামের একটা পদার্থ থাকে। এই পিউরিন লিভারে বিপাকক্রিয়ায় ইউরিক এসিডে পরিণত হয়। ইউরিক এসিড আমাদের রক্তনালী সহ কোষ কলাকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। একজন মানুষের দেহে দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম পিউরিন প্রয়োজন।

ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে কি হয়?

ইউরিক এসিড মূলত কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে বের হয়। শরীরে অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে কিডনি দ্রুত পর্যাপ্ত ইউরিক এসিড অপসারণ করতে পারে না। ফলে আমাদের অস্থিসন্ধি বা হাড়ের জয়েন্ট গুলোতে এই ইউরিক এসিড জমা হতে থাকে। গাউট বা গেঁটে বাত হাড়ের জয়েন্ট গুলোতে ইউরিক এসিড ক্রিস্টাল আকারে জমে থাকার ফলে হয়।

ইউরিক এসিড বৃদ্ধির ফলে গাউট বা গেঁটে বাত হয়। আক্রান্ত স্থান ফুলে লাল হয়ে যায় ও প্রচন্ড ব্যথা হয়। গেঁটে বাত হল একটি ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে দরকার স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ম মেনে লাইফ টাইম খাওয়া।

ইউরিক এসিড রোগীর খাবার তালিকা

ইউরিক এসিড কমাবে যে তিন খাবার

প্রাণিজ প্রোটিন জাতীয় খাবারে পিউরিন বেশি থাকে। প্রাণীদেহের বিভিন্ন অংশের মাংস যেমন: রেড মিট, কলিজা, মস্তিষ্কের মাংস ইত্যাদিতে প্রচুর পিউরিন রয়েছে। তাছাড়া মাশরুমে পিউরিন রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। অত্যাধিক পিউরিন যুক্ত খাবার গুলো খাওয়ার ফলে শরীরে ইউরিক এসিড বাড়ে। আসুন এক নজরে ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণকারী খাবার গুলো সম্পর্কে জানা যাক।

  • ডেইরি প্রোডাক্ট: যেমন দুধ, দই এবং কটেজে পনির
  • উদ্ভিদ ভিত্তিক তেল: যেমন অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো অয়েল, কোকোনাট অয়েল এবং ক্যানোলা অয়েল
  • ডাল: যেমন মটরশুটি, মটর এবং মসুর ডাল ইত্যাদি ডাল জাতীয় খাবার
  • শাকসবজি: লাউ, পালং শাক, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি শাকসবজি।
  • ফল: কম গ্লুকোজ ও উচ্চ আঁশ যুক্ত সব ধরনের ফল। যেমন: সাইট্রাস ফল (কমলা, জাম্বুরা, মাল্টা ইত্যাদি)
  • গোটা শস্য: যেমন কুইনোয়া বা কাউন চাল, বার্লি, ওটস, বাদামী চাল সহ সবধরনের গোটা শস্য।
  • বাদাম: যেমন চিনা বাদাম, কাজু, পেস্তা, আখরোট এবং ম্যাকাডামিয়া বাদাম
  • প্রোটিন জাতীয় খাবার: যেমন মুরগি, টার্কি, ডিম

আরো পড়ুন: কম ক্যালরি যুক্ত খাবারের তালিকা। ওজন কমানোর আদর্শ খাবার।

এক কথায় ডিম ও মুরগির মাংসের মত চর্বিহীন প্রোটিন জাতীয় খাবার, বাদাম, গোটা শস্য, দুগ্ধ জাত খাবার, শাকসবজি ও উচ্চমাত্রার ফাইবার সমৃদ্ধ ফলগুলো ইউরিক এসিড কমাতে সাহায্য করে।

ইউরিক এসিডে নিষিদ্ধ খাবার

এ পর্যায়ে আমরা জানবো ইউরিক এসিডে নিষিদ্ধ খাবার গুলো সম্পর্কে। নিচে উল্লেখিত খাবার গুলো ইউরিক এসিড বাড়ায়।

পিউরিন যুক্ত খাবার

ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণে পিউরিন যুক্ত সব ধরনের খাবার বাদ দিতে হবে। প্রাণিজ মাংস এবং সামুদ্রিক মাছে পিউরিন বেশি থাকে। তাছাড়া অ্যালকোহল এবং ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ খাবারগুলোতে পিউরিন বেশি থাকে যা খেলে শরীরে ইউরিক এসিড বৃদ্ধি পায়। মধু ও অনেক মিষ্টি ফলে প্রচুর ফ্রুক্টোজ থাকে।
 
পিউরিন যুক্ত খাবার গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
  • রেড মিট: যেমন গরুর মাংস, খাসি বা ভেড়ার মাংস ইত্যাদি।
  • অর্গান মিট: লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক সহ অন্যান্য অর্গান মাংস।
  • সামুদ্রিক খাবার: যেমন ঝিনুক ও সব ধরনের সামুদ্রিক মাছ।
  • অ্যালকোহল: অ্যালকোহল সমৃদ্ধ সব ধরনের খাবার ও পানীয়
এই জাতীয় খাবার গুলো ইউরিক এসিড বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে যাদের গাউট বা গেঁটে বাত আছে এই খাবারগুলো সম্পূর্ণ পরিহার করা উচিত।

ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ খাবার

ন্যাচারাল অনেক খাবারে ফ্রুক্টোজ থাকে। যেমন: মধু, কিছু শাকসবজি, ফল ও ফলের রস ইত্যাদি। এই সবগুলোই স্বাস্থ্যকর খাবার যা আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। বিশেষ করে ফল জাতীয় খাবার গুলো। ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ নানা ধরনের পুষ্টির উৎস ফল।
 
ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে বাড়তে পারে ইউরিক এসিড। তবে ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ খাবার একেবারে বাদ দিবেন না। এগুলো শরীরের জন্য অনেক উপকারী তাই খেতে হবে পরিমিত মাত্রায়।
 
ফ্রুক্টোজ বা চিনি দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে বানানো খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর।‌ চিনিযুক্ত সোডা পানীয়, মিষ্টি, চকলেট, আইসক্রিম এবং সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার একেবারে ছেড়ে দিন। মধু বা মিষ্টি ফল খাবেন পরিমিত মাত্রায়। ইউরিক এসিড বাড়ার কোন ঝুঁকি থাকবে না।

খাবারের অনিয়ম ও ডিহাইড্রেশন

খাবারের অনিয়ম ও ডিহাইড্রেশন ইউরিক এসিড বৃদ্ধির কারণগুলোর একটি। সব সময় হাইড্রেট থাকতে হবে এবং নিয়মিত খাবার খেতে হবে। পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে।

ইউরিক এসিড কমাবে যে তিন খাবার

অনেকেই ইউরিক এসিড কমাতে বিশেষ তিনটি খাবার সম্পর্কে জানতে চায়। আমরা এখানে দ্রুত ইউরিক এসিড কমানোর ৬ টি খাবার সম্পর্কে জানিয়েছি। আপনার পছন্দ অনুযায়ী যে কোন খাবার বেছে নিতে পারেন।

১.চেরি

চেরি একটি বিদেশি ফল। এটি ইউরিক এসিড এবং গেঁটে বাত কমাতে বিশেষ দারুন কাজে দেয়। আসলে চেরিতে অ্যান্থোসায়ানিন নামের ন্যাচারাল অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান রয়েছে। যা ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমায়।
 
ইউরিক এসিডকে জয়েন্টে স্ফটিক আকারে জমা হতে বাধা দেয় অ্যান্থোসায়ানিন। তাই গেঁটে বাত হলে চেরি চেরি ফল খেলে বেশ উপকার পাওয়া যাবে।

২.কলা

কলাতে পিউরিন খুবই কম। কলা খেলে ইউরিক এসিড বাড়ার কোনো ঝুঁকি নেই। এই রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে বেশ উপকার পাবেন কলা খেলে।

৩.আপেল

আপেলে থাকে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার।এই ডায়েটারি ফাইবার রক্ত থেকে ইউরিক এসিড শোষণ করে নেয়। যার কারণে শরীরে অতিরিক্ত ইউরিক এসিড দূর হয়। তাছাড়া আপেলে ম্যালিক এসিড‌ থাকে যা ইউরিক এসিড নিউট্রালাইজড করে মাত্রা কমিয়ে ফেলে।

৪.সাইট্রিক এসিড

ইউরিক এসিড কমাতে ম্যাজিকের মত কাজ করে সাইট্রিক এসিড। প্রাকৃতিকভাবে এই সাইট্রিক এসিড পাওয়া যায় সাইট্রাস ফলগুলোতে। কমলা ও লেবুর মত সাইট্রাস ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও সাইট্রিক এসিড থাকে। যা রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

৫.গ্রিনটি

গ্রিনটি কে আমরা ওজন কমানোর হাতিয়ার হিসেবে বেশি জানি। ইউরিক এসিড কমাতেও গ্রিন টি কার্যকর। তাই নিয়মিত গ্রিন টি আপনাকে গেঁটে বাত থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করবে।

৬.কফি

কফি ইউরিক অ্যাসিড কমাতে পারে বলে গবেষণায় জানা গেছে। ক্যাফিন জাতীয় খাবারে যদি আপনার কোন সমস্যা থাকে তাহলে একজন ডাক্তারের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করে নিলে ভালো। কফি পান সঠিক সিদ্ধান্ত কিনা সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। কেননা কফি পানে অনেকের নানা ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *