স্ট্রোক এর লক্ষণ, যে সকল লক্ষণ দেখে স্ট্রোক সনাক্ত করা সম্ভব‌।

স্ট্রোক একটি রোগ যা আমাদের অনেকের কাছে ব্রেন স্ট্রোক নামে পরিচিত। স্ট্রোক হলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা যায়।
 
স্ট্রোক হওয়ার কারণ ও স্ট্রোকের লক্ষণগুলো সম্পর্কে এই নিবন্ধে বিস্তারিত জানানো হবে। স্ট্রোক প্রতিরোধ ও নির্ণয় করতে এই বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন।

স্ট্রোক এর কারণ

আমরা অনেকেই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক একসাথে গুলিয়ে ফেলি। মনে করি হার্টের কোন সমস্যার কারণে স্ট্রোক হয়। অনেকেই আবার মনে করে স্ট্রোক দু ধরনের হার্ট স্ট্রোক ও ব্রেন স্ট্রোক। এই সবগুলো একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
 
স্ট্রোক আসলে হার্টের কোন রোগ নয়। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালী বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা ফেটে যাওয়ার কারণে স্ট্রোক হয়। স্ট্রোকের অনেক কারণ রয়েছে, এখানে মূল কারণগুলো সম্পর্কে জানানো হয়েছে।
 
১. উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন না করলে অথবা কিছুদিন ওষুধ সেবনের পর বন্ধ করে দিলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
 
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না।
 
২. সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য যেমন: সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি এবং মাদক সেবনে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
 
স্ট্রোক এর লক্ষণ
৩. রক্তে অত্যাধিক কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। তাছাড়া মানসিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
 
. অতিমাত্রায় তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার গুলো খাওয়ার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। দেহের অতিরিক্ত ওজন স্ট্রোকের অন্যতম একটি কারণ।
 
৫. জন্মগতভাবে মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালী সরু হলে স্ট্রোকের একটা ঝুঁকি থাকে।
 
এই গুলো হল স্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। আরো কিছু কারণ রয়েছে যেগুলো স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন: অত্যাধিক লবণ খাওয়া, অ্যালকোহল পান, অতিরিক্ত মাত্রায় বেশি বেশি করে কার্বনেট যুক্ত পানীয় পান, ও কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ

১. স্ট্রোকের কারণে প্যারালাইসিস হয় যা আমরা সবাই জানি। প্যারালাইসিস হলো শরীরের কোন একটা অংশ বা অঙ্গ ঠিকমতো কাছে না করা, অবশ লাগা, দুর্বল বোধ হওয়া।
 
২. ব্রেন স্ট্রোক এর কারণে ফেসিয়াল প্যারালাইসিস বা ফেসিয়াল পালসি হতে পারে। ফেসিয়াল পালসি হলে মুখের এক পাশ বাঁকা হয়ে যায়। ব্রেন স্ট্রোক ছাড়া ভাইরাল ইনফেকশন, ঠান্ডা জনিত সমস্যায়, ওটাইটিস মিডিয়া ইত্যাদি কারণে ফেসিয়াল পালসি হতে পারে।

আরও পড়ুন এলার্জি চুলকানি দূর করার ঘরোয়া উপায়।

 
লক্ষণীয় বিষয়: বিষয়টা স্পষ্ট যে, ফেসিয়াল প্যারালাইসিস বা ফেসিয়াল পালসি হলে নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে এটা ব্রেন স্ট্রোকের কারণে হয়েছে। ফেসিয়াল প্যারালাইসিস এর কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা খুবই সামান্য।
 
এই রোগের ক্ষেত্রে কানের পিছনের অংশে ব্যথা, মাথার একপাশে অবশ লাগ, হঠাৎ করে মুখের একপাশে তীব্র ব্যথা ও অবসরে যাওয়া, চোখে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এক বা একাধিক এই লক্ষণগুলো কারো মধ্যে দেখা দিলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
 
৩. স্ট্রোক হলে চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা, একই জিনিস ডাবল দেখা ও মাথা ঘুরানোর অনুভূতি থাকতে পারে।
 
৪. কখনো কখনো রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। অস্পষ্টভাবে কথা বলা বা কথা বলতে অসুবিধা বোধ হওয়া স্ট্রোকের একটি সাধারণ উপসর্গ।

ব্রেইন স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়

স্ট্রোক প্রতিরোধে আমাদের স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বেছে নিতে হবে। একটা স্বাস্থ্যকর জীবন ধারা স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
১. যেহেতু স্ট্রোকের অন্যতম একটি কারণ হল উচ্চ রক্তচাপ তাই স্ট্রোক প্রতিরোধে হাইপারটেনশন অর্থাৎ হাই প্রেসার রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
 
এক্ষেত্রে অবশ্যই উচ্চ রক্তচাপ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক ওষুধ সেবন করতে হবে এবং ডাক্তারের অন্যান্য পরামর্শ গুলো মেনে চলতে হবে।
 
২. রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, কিডনি রোগ ও শরীরের ওজন স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রাখতে হবে। কেননা কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, বিভিন্ন কিডনি রোগ ও অতিরিক্ত শারীরিক ওজন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
 
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কোলেস্টেরল ও চর্বিযুক্ত খাবারগুলো খাওয়া যাবে না। খাদ্যাভাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে।
 
৩. ধূমপান ও কোন ধরনের মাদক সেবন করা যাবেনা।
 
৪. স্ট্রোক প্রতিরোধে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

স্ট্রোক নিয়ে পরিশেষ

স্ট্রোক একটি খুব জটিল রোগ যখন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। তাই স্ট্রোক হলে অর্থাৎ স্ট্রোকের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল অথবা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। বেশি দেরী হলে প্যারালাইসিস এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
 
একটি স্বাস্থ্যকর লাইফ স্টাইল স্ট্রোক প্রতিরোধে অনেকাংশে সাহায্য করে। স্ট্রোক প্রতিরোধে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শরীরে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে কমাতে হবে, মানসিক দুশ্চিন্তা কমাতে হবে , অলস জীবন যাপন পরিত্যাগ করতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে ও প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি খেতে হবে। আসুন আমরা সবাই স্ট্রোক প্রতিরোধে একটু সতর্ক হই।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *