নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার।

নিউমোনিয়া হল ফুসফুসের সংক্রমণ জনিত রোগ। আমাদের ফুসফুস স্পঞ্জের মত নরম। যখন ফুসফুসে জীবাণুর সংক্রমণ হয় তখন শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রমে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে, আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয় অর্থাৎ অক্সিজেনের অভাবে শরীর আরো খারাপ হতে থাকে। এই অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া অত্যন্ত জরুরি, কালবিলম্ব হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 

যেকোনো বয়েসের ব্যাক্তি এই ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তবে ২ বছরের কম শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারন তাদের রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা সাধারণত কম হয়।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দরকার সচেতনতা ও উন্নত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাছাড়া নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া প্রতিরোধে শিশুদের পিসিভি টিকা দেওয়া হয়। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন।

নিউমোনিয়া কেন হয়?

নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমনের কারণে হয়ে থাকে। এই সংক্রমণ একটি অথবা দুটি ফুসফুসে হতে পারে।

নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস ঢুকে আক্রমণ করে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই আক্রমণ প্রতিরোধ করে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হলে শরীর জীবাণুর এই আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। যে কারণে ফুসফুসে ইনফেকশন হয় এবং নিউমোনিয়া ও অন্যান্য ফুসফুসের সংক্রমণ জনিত রোগ দেখা দেয়। একারণে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ব্যক্তিদের এই রোগ বেশি হয়।

ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা নিউমোনিয়া হলে তা আক্রান্ত ব্যাক্তি হতে অন্য ব্যাক্তিতে ছড়িয়ে যেতে পারে। ধুমপান, মদ্যপান করা ব্যাক্তিদের নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • নিউমোকোকাল ডিজিজ 
  • ফ্লু ভাইরাস
  • নিউমোসিস্টিস নিউমোনিয়া
  • রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (যা এক বা তার কম বছর বয়সী শিশুদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ) 
  • স্ট্রেপট্রোকক্কাস নিউমোনিয়া
  • মাইকোপ্লাজমা নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়া।
  • হিউম্যান প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস

আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। তাই হাঁচি-কাশির সময় আমাদের রুমাল, টিস্যু বা কনুই ব্যাবহার করতে হবে এবং লোক সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে।

হাসপাতালের ভেন্টিলেটর যন্ত্র বা শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত যেকোন যন্ত্রের (যেমনঃ নেবুলাইজেশন, অক্সিজেন যেগুলো একাধিক ব্যাক্তি কর্তৃক ব্যাবহৃত হয়) মাধ্যমেও নিউমোনিয়া ছড়াতে পারে।

নিউমোনিয়ার লক্ষণ

নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো সবার ক্ষেত্রে এক নাও হতে পারে। লক্ষণ গুলি সংক্রমণের এজেন্ট, আক্রান্ত ব্যাক্তির বয়স ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। 
সাধারণ লক্ষণ গুলির মধ্যে রয়েছে:
  • শ্বাস-প্রশ্বাস বা কাশির সময় বুকে ব্যাথা
  • কাশির সাথে শ্লেষ্মা বা কফ থাকে
  • ক্লান্তি বা ক্ষুধা কমে যায় 
  • জ্বর ও ঘাম হয়
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া ও ডায়রিয়া 
  • শ্বাস কষ্টও হতে পারে।
  •  মারাত্মক নিউমোনিয়ায় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ ভেতরের দিক ডেবে যায়।
যদি আপনার কাশি,জ্বর ও শ্বাসকষ্ট থাকে তাহলে একজন সাথে যোগাযোগ করা উচিৎ। কারণ এই লক্ষণ গুলো নিউমোনিয়া অন্যান্য রোগ যেমন: করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারনেও প্রকাশ পেতে পারে। 

নিউমোনিয়া হলে করণীয় 

সময়মত, সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। 
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা অনেকটা এর কারনের উপর নির্ভর করে। যেমনঃ
 
যদি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারনে হয়ে থাকে তাহলে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক‌‌‌ দিয়ে চিকিৎসা করবেন। এক্ষেত্রে  ডাক্তার নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিক‌‌‌ ও অন্যান্য ওষুধগুলো ঠিকঠাক সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত ফলোআপের জন্য ডাক্তারের নিকট যেতে হবে। 
 
যদি ভাইরাস সংক্রমণের কারনে নিউমোনিয়া হয় তাহলে রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হবে, প্রচুর পরিমানে তরল খাবার ও পানি পান করতে হবে এবং জ্বরের জন্য জ্বর নাশক ওষুধ সেবন করতে হবে। তবে এই বিষয় গুলো আপনার ডাক্তারই নিশ্চিত করবেন।
 
যদি নিউমোনিয়ার উপসর্গগুলো জটিল ভাবে প্রকাশ পায়, আপনার ডাক্তার আপনাকে হাসপাতালে রেফার করতে পারে। তবে সম্পুর্ন সুস্থ হতে সময় লাগতে পারে। যদি শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তাহলে অক্সিজেন ও নেবুলাইজেশনের প্রয়োজন হয়।
 
নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কখনোই কাল বিলম্ব করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৩ শতাংশ শিশু মারা যায় এই রোগে যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে।

নিউমোনিয়া রোগীর খাবার

রোগীকে যথেষ্ট বিশ্রামে থাকতে হবে এবং প্রচুর পরিমানে পানি ও তরল খাবার (পুষ্টিকর তরল খাবার যেমনঃ ফলের রস, চা ইত্যাদি) খেতে হবে। পানি ও তরল খাবার পানিশূন্যতা রোধের পাশাপাশি বুকের শ্লেষ্মাকে পাতলা করতে সাহায্য করে।
 
শরীর ও শ্বসনতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন-সি ও অন্যান্য ভিটামিন যুক্ত খাবার খেতে হবে। 
কিন্তু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর ক্ষুধামান্দ্য
হয় অর্থাৎ ক্ষুধা কমে যায় এবং খাওয়ার রুচি থাকে না। তাই রোগীকে একটু পর পর অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ভিটামিন সি পেতে লেবুর শরবত ও ফলের জুস খাবেন।
 
সাধারনত পুষ্টিকর খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে –
  • সংক্রমণ প্রতিরোধে করার জন্য সংক্রমণ প্রতিরোধী ভিটামিন, খনিজ লবণ ও শাকসবজি। 
  • শক্তি ও অন্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক রাখার জন্য দানাদার শস্য যেমন- বাদাম,বাদামী চাল,গমের আটা ইত্যাদি। 
  • স্বাস্থ্যকর প্রোটিন যুক্ত খাবার,যেমনঃ মাছ,হাঁস মুরগির মাংস বা ডিম ইত্যাদি। 
  • প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামর জন্য কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধ জাত খাবার।
অনেক ডাক্তার দুধ জাতীয় খাবারের পরামর্শ দিয়ে থাকলেও অনেক ডাক্তার আবার নিষেধ করেন। কারন দুগ্ধ জাত খাবার বুকের কফ বাড়িয়ে দেয়।
তাই দুগ্ধ জাত খাবার না খাওয়াই ভালো। একটু সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে ক্ষুধার পরিমান বাড়তে পারে, তখন স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে। 

নিউমোনিয়া সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: নিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টি করে কোন ব্যাকটেরিয়া?

উত্তর: স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি, মাইকোপ্লাজমা নিউমোনি ও নিউমোক্কাল ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের কারণে নিউমোনিয়া রোগ হয়। হিউম্যান প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস ইত্যাদি ভাইরাসের কারণেও হতে পারে।

প্রশ্ন: নিউমোনিয়ার টিকার নাম কি?

উত্তর: বাজারে যে টিকা পাওয়া যায় তার নাম নিউমোভ্যাক্স-২৩। টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পিসিভি টিকা যা শিশুদের নিউমোক্কাল ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে দেওয়া হয়। এই টিকা শুধু নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করে। এটি অন্যান্য নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *