রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি হলেই কি কিডনির সমস্যা? বিস্তারিত।

ক্রিয়েটিনিন হলো আমাদের শরীরে তৈরি হওয়া এক ধরনের বর্জ্য পদার্থ। মাংসপেশীর ক্রিয়েটিন ফসফেট ভাঙ্গার কারণে এটি তৈরি হয়। প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন খাওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শরীরে কিছুটা বেশি ক্রিয়েটিনিন তৈরি হয়। তবে এর অতিরিক্ত বৃদ্ধি কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা কিডনি রোগের ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের শরীরে একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে ক্রিয়েটিনিন তৈরি হয়। কিডনি ক্রিয়েটিনিন ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিডনি সঠিকভাবে তার কাজ করতে ব্যর্থ হলে শরীরে এই বর্জ্য পদার্থ বেড়ে যায়। সাধারণত s.creatinine পরীক্ষা করে শরীরে ক্রিয়েটিনিন এর পরিমাণ সম্পর্কে জানা যায়। এর স্বাভাবিক মাত্রা বয়স ও জেন্ডারের উপর নির্ভর করে।

ক্রিয়েটিনিন কমানোর উপায়

আমাদের লিভারে ফসফো-ক্রিয়েটিন নামের এক ধরনের কম্পাউন্ড তৈরি হয়। এই পদার্থ পেশিতে স্থানান্তরিত হয়। পেশি শক্তি তৈরি করার সময় ফসফো-ক্রিয়েটিন ভেঙে ক্রিয়েটিনিনে পরিবর্তিত হয়। মাংসপেশিতে মেটাবলিজমের পর এই বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়।

এই ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্ট হিসেবে পাওয়া যায়। সাধারণত বডি বিল্ডার, খেলোয়ার বা অ্যাথলেটিক শক্তি বাড়াতে এই সাপ্লিমেন্ট নেয়। ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্টের দীর্ঘ মেয়াদি ব্যবহার বডিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাদের কিডনি রোগ আছে বা যারা কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছে। ক্রিয়েটিনিন কমিয়ে কিডনি সুস্থ রাখতে চাইলে ক্রিয়েটিন যুক্ত কোন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যাবে না।

রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি হলেই কি কিডনির সমস্যা

পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার যুক্ত খাবার খান

ফাইবার রক্তের ক্রিয়েটিনিন কমাতে খুব দারুণভাবে কাজ করে। ফল, সবজি, গোটা শস্য, ডাল জাতীয় খাবার গুলোতে প্রচুর পরিমানে ফাইবার থাকে। গোটা শস্য ও ডাল জাতীয় খাবারে প্রোটিন বেশি থাকে। তাই পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে। পর্যাপ্ত ফাইবার পেতে ফলমূল ও শাকসবজি খেতে পারেন।

অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া যাবে না

বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী প্রোটিন বেশি খেলে রক্তে ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধি পায়। তাই প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন। বিশেষ করে গরুর মাংস বা রেড মিট বা লালা মাংস যত কম খাওয়া যায় ততই ভালো। রেড মিট ও অন্যান্য প্রোটিন যুক্ত খাবার গুলো অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া বন্ধ করুন।

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন

পানি শূন্যতার কারণে বেড়ে যেতে পারে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা। তাই সবসময় হাইড্রেট থাকতে হবে। খেতে হবে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার। তবে চিকিৎসকরা কিডনি রোগীদের দৈনিক কতটুকু পানি পান করতে হবে তা বলে দেয়। নির্দেশনার চাইতে বেশি পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

লবণ খাওয়া কমিয়ে দিন

লবণ ছাড়া খাবার খাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। এভাবে লবণে অভ্যস্ত হলে কিডনিতে খারাপ প্রভাব পড়বে। প্রসেস ফুড এবং ফাস্ট ফুড গুলো সোডিয়াম এবং ফসফরাস দিয়ে ভরপুর থাকে। খেতে সুস্বাদু ঠিকই কিন্তু এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

এসব খাবারে অভ্যস্ত হলে কিডনির কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আর কিডনির কার্যকারিতা কমলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাবে। অত্যাধিক লবণযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। পরিমাণ মতো লবণ খাওয়ার অভ্যাস করুন কিডনি ভালো থাকবে।

অতিরিক্ত ব্যাথা নাশক ওষুধ সেবন বন্ধ করুন

অতিরিক্ত ব্যাথা নাশক ওষুধ সেবন বন্ধ করুন
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথা নাশক ওষুধ খাবেন না। বিশেষ করে ননস্টেরয়েড অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ওষুধগুলো কিডনির জন্য ক্ষতিকর। রোজ রোজ ব্যথানাশক ওষুধের ওভার ডোজের ফলে কিডনি কার্যকারিতা হারাতে থাকে। নিয়ম মেনে ওষুধ খেলে কিডনি এবং ক্রিয়েটিনিনের লেভেল ঠিক খাকবে।

ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন

তামাক এবং অ্যালকোহল দুটোই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর একথা আমার জানি। ধূমপানে কিডনির উপর খারাপ প্রভাব পড়ে যা অনেক বিশেষজ্ঞরা বলে।

অ্যালকোহল ক্রনিক কিডনি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে ছেড়ে দিন। আর যদি না থাকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। কেননা ক্রিয়েটিনিনের লেভেল স্বাভাবিক রাখতে কিডনি ভালো রাখা জরুরি।

ক্রিয়েটিনিন কমানোর খাবার

ক্রিয়েটিনিন কমাতে খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে। গরু বা খাসির মাংস ও অন্যান্য রেড মিট কম করে খেতে হবে। ফাইবার যুক্ত খাবার গুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে। প্রতিদিন একবাটি মসুর ডাল খাদ্য তালিকায় রাখুন। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার একবারে বাদ দেওয়া যাবে না। ৭৫ গ্রাম ওজনের কম এক টুকরো মুরগির মাংস দৈনিক খাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন কোন ফলে কতটুকু ক্যালরি থাকে এর তালিকা।

গোটা শস্য, ফলমূল ও শাকসবজি খাবেন পর্যাপ্ত পরিমাণ। এসব খাবারে প্রচুর ফাইবার থাকে। ক্রিয়েটিনিন নরমাল রাখতে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুবই জরুরি। লবণ খাবেন খুব কম করে, ছেড়ে দিতে পারলে আরো ভালো। অত্যাধিক লবণ যুক্ত খাবার খাবেন না। ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, কিডনি ভালো থাকলে ক্রিয়েটিনিন নরমাল থাকবে।

ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধির কারণ

ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি বাড়ে কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে বা কিডনি রোগ হলে। তবে গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তে পারে যা স্বাভাবিক। বেশি বেশি রেড মিট ও প্রোটিন খেলেও বাড়তে পারে। সাময়িকভাবে ক্রিয়েটিনিন বাড়ার আরো কিছু কারণ রয়েছে। যেমন: কঠোর পরিশ্রম, ব্যায়াম, সালফামেথক্সাজল জাতীয় ওষুধ, ট্রাইমেথোপ্রিম বা কেমোথেরাপির ওষুধের প্রভাব ইত্যাদি।

 s.creatinine কখন টেস্ট করতে হয়

প্রস্রাবের পরিবর্তন (প্রস্রাবের সময় ব্যথা, ফেনা বা রক্ত থাকা) হলে সিরাম ক্রিয়েটিনিন টেস্ট করা উচিত। চোখের চারপাশ ফুলে গেলে এবং পা বা গোড়ালি ফুলে গেলে এই টেস্ট করতে হয়।

কিছু রোগ কিডনির উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকরা এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে মাঝে s.creatinine টেস্ট করতে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এই ধরনের রোগ গুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ডায়াবেটিস
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • থাইরয়েড রোগ
  • অটোইমিউন ডিজিজ
  • কিডনিতে ইনফেকশন
  • মূত্রনালীর প্রতিবন্ধকতা

কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস। অর্থাৎ মা বাবা, ভাই বা বোন কারো কিডনি রোগ থাকলে s.creatinine টেস্ট করা দরকার।

s.creatinine নরমাল কত?

সিরাম ক্রিয়েটিনিন টেস্ট রিপোর্টে ফলাফলের পাশাপাশি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডান দিকে এর নরমাল ভেল্যু লেখা থাকে। new born, male এবং female লেখার সাথে creatinine নরমাল ভেল্যু উল্লেখিত থাকে।

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রা হলো ০.৬ থেকে ১.২ মি:গ্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে।
প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের বেলাতে স্বাভাবিক মাত্রা ০.৫ থেকে ১.১ মি:গ্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে।
কিশোরদের স্বাভাবিক মাত্রা ০.৫ থেকে ১.০ মি:গ্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে।
শিশুদের বেলায় এই স্বাভাবিক মাত্রা ০.৩০ থেকে ০.৭ মি:গ্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *