কম ক্যালরি যুক্ত খাবারের তালিকা। ওজন কমানোর আদর্শ খাবার।

খাবার খেতে গেলেই ক্যালরির কথা মনে হয়। সারাদিন কতটুকু ক্যালরি গ্রহণ করলাম, বেশি ক্যালরি হলে তো ওজন বেড়ে যাবে। এসব প্রশ্ন মনে হওয়া স্বাভাবিক যদি আপনি ক্যালরি হিসেব করে খাবার খান।

শরীরের ওজন কমাতে কম ক্যালরির খাবারগুলো হতে পারে সাফল্যের চাবিকাঠি। কম ক্যালরি গ্রহণ করার পাশাপাশি ওজন কমানোর অন্যান্য টিপস গুলো ফলো করতে হবে। দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। তাই সীমিত পরিসরে ক্যালরি গ্রহণের পাশাপাশি খরচ করার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে শরীরে ফ্যাট বাড়ে। পেটে ফ্যাট বা মেদ জমলে তাকে ভিসারাল ফ্যাট বলে। এই ভিসারাল ফ্যাট অনেক জটিল রোগের জন্য দায়ী। বিশেষ করে কার্ডিও ভাস্কুলার ডিজিজ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় ভিসারাল ফ্যাট। কম ক্যালরির স্বাস্থ্যকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বজায় রেখে ভিসারাল ফ্যাট বা মেদ ভুঁড়ি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

কম ক্যালরি যুক্ত খাবারের তালিকা

কম ক্যালরির ফল

প্রথমেই আমরা জানবো কম ক্যালোরি যুক্ত ফলগুলো সম্পর্কে। অনেক ফলফলাদি রয়েছে যাদের ক্যালরি কম কিন্তু পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকে। এই ফলগুলো কম ক্যালরি সরবরাহ করার পাশাপাশি অনেক পুষ্টির চাহিদা পূরণে করবে।

আসুন কম ক্যালরি সমৃদ্ধ এই ফলগুলো সমন্ধে জেনে নেয়া যাক।

জাম্বুরা: জাম্বুরা ভিটামিন সি দিয়ে ভরপুর একটি সাইট্রাস ফল। আসলে সব ধরনের সাইট্রাস ফল তাদের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা জন্য আমাদের কাছে সুপরিচিত। শরীরের ইনফ্লামেশন কমাতে এবং হার্ট ও ব্রেইন সুস্থ রাখতে সাইট্রাস ফল খাওয়া প্রয়োজন।

ক্যালরির পরিমাণ: একটি মাঝারি সাইজের অর্ধেক জাম্বুরা প্রায় ১২৩ গ্রাম ওজন হয় যা থেকে ১২৩ ক্যালরি পাওয়া যায়।

আপেল এবং নাশপাতি: ভিটামিন সি, পেকটিন, পলিফেনল এবং ফাইবার হল আপেলের মূল পুষ্টি উপাদান। আপেলের চাচাতো ভাই নাশপাতি যা আপেলের মতো পুষ্টি উপাদান বহন করে। আপেলের চামড়ায় ফাইবার থাকে। তাই ভালোভাবে ধুয়ে চামড়াসহ আপেল খেলে ভালো।

ক্যালরির পরিমাণ: ১০০ গ্রাম একটি আপেলে প্রায় ৫৭ ক্যালরি রয়েছে।

পেঁপে: ফাইবার, ভিটামিন সি এবং ফোলেট সমৃদ্ধ আরো একটি ফল হল পেঁপে। হজম শক্তি বৃদ্ধিতে পেঁপে দারুন ভাবে কাজ করে। পেঁপেতে প্যাপেইন নামের এনজাইম থাকে যা পিরিয়ডের তলপেটের ব্যথা কমাতে কার্যকর।

ক্যালরির পরিমাণ: একটি পেঁপের প্রতি ১০০ গ্রাম অংশে মাত্র ৩৯ ক্যালরি থাকে।

তরমুজ: একটি তরমুজের প্রায় ৯০ ভাগ জলীয় অংশ বা পানি থাকে। গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড রোদে গরমে ঘামের ফলে শরীরে পানির অভাব দেখা দিতে পারে। এসময় কিছুটা তরমুজ খেলে পানির তৃষ্ণা মিটবে ও ক্লান্তি দূর হবে। তরমুজে লাইকোপিন নামের এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা মহিলাদের জরায়ুর ক্যান্সারের কম ঝুঁকি কমায়।

ক্যালরির পরিমাণ: একটি তরমুজের প্রতি ১০০ গ্রাম অংশ মাত্র ৩৪ ক্যালরি ধারণ করে।

সাইট্রাস ফল: কমলা, মাল্টা, লেবু, জাম্বুরা এবং সব ধরনের সাইট্রাস ফল ভিটামিন সি এর একটা বড় উৎস। সাইট্রাস ফলে পটাসিয়াম ও ফাইবার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। এজাতীয় ফলে বিটাক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ থাকে যা আমাদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে দরকার। নিয়মিত সাইট্রাস ফল খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও রক্তনালী পরিষ্কার থাকে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাইট্রাস দারুন ভাবে কাজ করে বলে পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন।

ক্যালরির পরিমাণ: কমলার প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৭ ক্যালরি ধারণ করে।

কম ক্যালরি যুক্ত শাকসবজি

শাকসবজির পুষ্টিগুণের কথা আমরা সবাই জানি। এজন্য ডাক্তাররা প্রতিদিন বেশি বেশি শাকসবজি খেতে বলে। একটা প্রবাদ আছে ঘি তে থাকে বল শাকসবজি খেলে পরিষ্কার মল। অর্থাৎ শাকসবজিতে আঁশ বা ফাইবার থাকে যা কোষ্ঠকাঠিন্য মুক্ত রাখে।

ওজন কমাতে চাইলে অবশ্যই কম ক্যালরির শাকসবজি গুলো খেতে হবে। আমরা এখানে বাছাই করে সবচেয়ে কম ক্যালরি সমৃদ্ধ শাকসবজির তালিকা প্রকাশ করেছি।

মূলা: সাদা এবং লাল দুই ধরনের মুলাই পুষ্টিকর। মূলাতে পটাসিয়াম, ফোলেট এবং ভিটামিন সি থাকে। মূলা খেলে ওজন বাড়ার ভয় নেই কারণ ক্যালরি অল্প পরিমাণে থাকে।

ক্যালরির পরিমাণ: ১১৬ গ্রাম ওজনের মূলার ১ টি টুকরো তে মাত্র ১৮ ক্যালরি থাকে।

শসা: শসা কম ক্যালরির একটি পরিচিত সবজি। শসা সালাদ হিসেবে খাওয়ার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। শসার বেশির ভাগ অংশ জলীয় তাই এর ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম। ৫২ গ্রাম ওজনের ১ টি শসাতে মাত্র ৮ ক্যালরি থাকে।

পালং শাক: ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থে ভরপুর আরেকটি কম ক্যালরির শাক হল পালং শাক। এতে ভিটামিন কে, প্রো-ভিটামিন এ এবং ফোলেট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে। তাছাড়া পালং শাকে ক্যারোটিনয়েড লুটেইন এবং জেক্সানথিনের মতো কম্পাউন্ড রয়েছে, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ গ্রাম পালং শাকে মাত্র ৭ ক্যালরি থাকে।

টমেটো: সস বানিয়ে, রান্না করে, সালাদ হিসেবে এমনকি পাকা টমেটো এমনিতেই খাওয়া যায়। টমেটোর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। স্ট্রোক ও হৃদরোগের মত জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে টমেটোতে থাকা লাইকোপিন নামক উপাদান। ভিটামিন সি, পটাসিয়াম, ফোলেট এবং ভিটামিন কে পাবেন টমেটোতে। ১৪৯ গ্রাম টমেটো ২৭ ক্যালরি ধারণ করে।

শালগম: শালগম পুষ্টিকর একটি সবজি যার ক্যালরি কম থাকে। রান্না করা ১৫৬ গ্রাম শালগমে মাত্র ৩৪ ক্যালরি থাকে।

কাঁচা মরিচ: পুষ্টিবিদের মতে মরিচে বিশেষ করে বেল মরিচে ভিটামিন সি এবং লাইকোপেনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে বেশি থাকে। ৯২ গ্রাম বেল মরিচ মাত্র ২৪ ক্যালরি সরবরাহ করে।

গাজর: গাজরে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড কম্পাউন্ড রয়েছে। যার মধ্যে লুটেইন এবং বিটা ক্যারোটিন অন্যতম যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। ১২২ গ্রাম ওজনের কাঁচা গাজর ৫০ ক্যালরি প্রদান করে।

অন্যান্য শাকসবজি: ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পেঁয়াজ, রসুন অল্প ক্যালরি ধারন করে।
১৫৫ গ্রাম রান্না করা ফুলকপি ৪০ ক্যালরি
১ কাপ বা ৮৯ গ্রাম বাঁধাকপি ২২ ক্যালরি সরবরাহ করে থাকে।

কম ক্যালরির প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার

প্রোটিন শরীরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। প্রোটিনের অভাবে দেখা দিতে পারে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা। কেননা এটি সেল ডিভিশন বা নতুন কোষ তৈরি, পেশির গঠন, হজম শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, রাসায়নিক বিক্রিয়া ও হরমোন সংশ্লেষণ সহকারে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

আরো পড়ুন ওজন কমাতে চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম। ওজন কমানোর টিপস।

প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে আমাদের প্রতিদিন প্রোটিনযুক্ত খাবার গুলো খেতে হবে। স্বাস্থ্যকর প্রোটিনযুক্ত খাবারের মধ্যে ডিম, বাদাম, চর্বিহীন মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত খাবার এবং কিছু শস্য দানা রয়েছে।

আপনি যদি শরীরের ফ্যাট কমাতে চান তাহলে প্রোটিন আপনাকে সাহায্য করবে। প্রোটিন ফ্যাট বার্ন করে অর্থাৎ শরীরের চর্বি গলায়। প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলো অন্যান্য খাবারের তুলনায় কম পরিমাণে খেলেই ক্ষুধা মিটে যায়। বেশি খাবার খেলে বডিতে বেশি ক্যালরি ঢুকবে। বেশি খাবার খাওয়ার ইচ্ছা দূর করে কম ক্যালরি গ্রহণে সাহায্য করে প্রোটিন যুক্ত খাবারগুলো।

ডিম: কম ক্যালরির উচ্চ প্রোটিনযুক্ত একটি খাবার হল ডিম। একটি বড় সাইজের ডিম সরবরাহ করে প্রায় ৭২ ক্যালোরি, ৬ গ্রাম প্রোটিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ লবণ। সকালের নাস্তায় ডিম রাখুন তাহলে সারাদিনে ক্যালরি গ্রহণ অনেকটা কমবে। আসলে আমাদের ক্ষুধা বাড়ায় ঘেরলিন নামের এক ধরনের হরমোন। প্রোটিন ঘেরলিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষুধা লাগতে দেয় না।

মাছ: উচ্চ প্রোটিন যুক্ত কম ক্যালোরির ডায়েট চার্টে মাছ রাখতে হবে। চর্বিহীন মাছে ক্যালরি কম থাকে এবং চর্বিযুক্ত মাছে ক্যালরি বেশি থাকে। যদি আপনি কম ক্যালরি গ্রহণ করতে চান তাহলে খাদ্য তালিকায় চর্বিহীন মাছ রাখুন। ৮৫ গ্রাম ওজনের ১টি কড মাছের পিসে থাকে ১৩ গ্রাম প্রোটিন ও ৬০ ক্যালরি।

চর্বিহীন মাংস: মাছ মাংস আমিষ বা প্রোটিন থাকে একথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু চর্বিযুক্ত মাংসে ক্যালরির পরিমাণ খুব বেশি। চর্বিহীন মাংসে ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

মুরগির বুকের মাংস ও টার্কি মুরগির মাংসে প্রোটিন বেশি ও ক্যালরি কম থাকে। ১১৩ গ্রাম রান্না করা মুরগির বুকের মাংস প্রায় ১৬৩ ক্যালোরি এবং ৩২ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করে।

চিয়া সিড: আপনি কি এমন খাবার খুঁজছেন যা উচ্চমাত্রায় ফাইবার ও প্রোটিন সরবরাহ করে। তাহলে চিয়া সিড নয় কেন। বীজ জাতীয় হাই প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলোর মধ্যে চিয়া একটি।

ফাইবার ও প্রোটিন এ দুটো ওজন কমাতে বিশেষভাবে কাজ করে। ২৮ গ্রাম চিয়া সিড ১৩৮ ক্যালোরি, ৪.৭ গ্রাম প্রোটিন এবং ৯.৮ গ্রাম ফাইবার প্রদান করতে পারে।

ক্যালোরি সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নোত্তর

ক্যালরি বেশি হলে কি হয়?
শরীরে মেদ চর্বি জমে ফলে ওজন বাড়ে। আর অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাই প্রেসার ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলো ছাড়াও অনেক রোগের সম্ভাবনা থাকে অতিরিক্ত শারীরিক ওজনের কারণে।

কি খেলে ওজন কমে?
কম ক্যালরি যুক্ত খাবার, উচ্চ মাত্রায় প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। সেই সাথে অস্বাস্থ্যকর তেল চর্বি, চিনি দিয়ে বানানো খাবার বাদ দিতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *