আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা।রক্তস্বল্পতা দূর করে যে সব খাবার।

সুস্থ থাকতে দেহের জন্য যে সকল পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন আয়রন সেগুলোর মধ্যে একটি। আয়রন হল একটি খনিজ লবণ। আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করার পর সেটাকে ফুসফুস থেকে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয় হিমোগ্লোবিন নামক এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ যা লোহিত রক্তকণিকায় থাকে। আর এই হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে প্রয়োজন আয়রনের।

শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায় ফলে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা হয়। রক্তশূন্যতায় ক্লান্ত লাগা, ফ্যাকাশে ত্বক, মাথাব্যথা, অবসন্নতা, শ্বাসকষ্ট, হার্টবিট বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে দেহে আয়রনের পরিমাণ প্রয়োজনীয় মাত্রায় রাখতে হবে। আর এজন্য আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গুলো পর্যাপ্ত পরিমানে খেতে হবে। তাই আপনাকে প্রথমে জানতে হবে কোন কোন খাবার গুলোতে সর্বাধিক পরিমাণে আয়রন থাকে।

প্রতিদিন কতটুকু আয়রন খেতে হবে

শরীরে আয়রনের চাহিদা বয়সের উপর নির্ভর করে। আবার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে আয়রনের চাহিদা ভিন্ন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ৮ থেকে ১০ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা।

তবে নারীদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন আয়রন একটু বেশিমাত্রায় গ্রহণ করতে হবে। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে দৈনিক ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু গর্ভাবস্থায় নারীদের অন্তত ২৫ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে আনন্দের বিষয় হলো প্রচুর আয়রন যুক্ত খাবার রয়েছে যেগুলো নিয়মিত খেলে আমাদের দৈনিক আয়রনের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।

আয়রন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা

এই নিবন্ধে আয়রন সমৃদ্ধ যে খাবারগুলো সম্পর্কে জানানো হবে সেগুলোতে আয়রন ছাড়াও আরো অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। আমরা সাধারণত দৈনিক যে সকল খাবারগুলো খাই সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ খাবারেই যথেষ্ট পরিমাণে আয়রন থাকে। কিন্তু যারা আয়রনের ঘাটতি জনিত সমস্যায় ভুগছেন তারা প্রতিদিন প্রয়োজনের চাইতে বেশি পরিমাণে আয়রন গ্রহণ করতে হবে। এজন্য তাদের এমন সব খাবার খেতে হবে যেগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন রয়েছে।

খুব বেশি আয়রনের ঘাটতি হলে চিকিৎসকরা আয়রন সাপ্লিমেন্ট অর্থাৎ আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেটা ভিন্ন কথা, আমার যদি প্রতিদিন সর্বাধিক আয়রন যুক্ত খাবার গুলো খাই তাহলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

জেনে নিন সর্বাধিক আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গুলো সম্পর্কে।

১.পালংশাক

যারা কম ক্যালরিযুক্ত খাবার খেতে চান পালংশাক তাদের জন্য উপযুক্ত খাবার। পালংশাকে ক্যালোরি কম হলেও এটি একটি পুষ্টিকর খাবার। পালংশাক আয়রন সহ আরো নানা পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। তাছাড়া পালংশাকে রয়েছে ভিটামিন সি ও ক্যারোটিনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। পালংশাকের ভিটামিন সি শরীরকে সর্বাধিক পরিমাণে আয়রন শোষণে সহায়তা করে।

পালংশাক ও অন্যান্য শাকের সাথে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট খাওয়া ভালো। কেননা যেকোনো শাকের সাথে অলিভ অয়েল বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর চর্বি খেলে শরীর শাক থেকে সর্বাধিক পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড শোষণ করতে পারে। ক্যান্সার প্রতিরোধে ক্যারোটিনয়েডের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

১০০ গ্রাম পালংশাকে প্রায় ২.৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

২. মাংস

মাংস একটি মজাদার পুষ্টিকর খাবার। আয়রনের ঘাটতি প্রতিরোধে মাছ-মাংস খেতে হবে। আমাদের অনেকেরই মাছ-মাংসে থাকা পুষ্টির ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই। কেননা আমরা অনেকেই মাছ-মাংসে শুধু প্রোটিন বা আমিষ থাকে বলে জানি।

মাছ-মাংসে প্রোটিন ও আয়রন ছাড়াও জিংক, সেলেনিয়াম এবং ভিটামিন বি এর কয়েকটি উপাদান রয়েছে। তাই আয়রন ও প্রোটিন সহ এই পুষ্টি উপাদান গুলো পেতে লাল মাংস বা রেডমিট খেতে হবে।

১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রায় ২.৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৩.কুমড়োর বীজ

আয়রন সমৃদ্ধ দানাদার খাবারের মধ্যে কুমড়োর বীজ অন্যতম। আয়রন ছাড়াও কুমড়োর বীজে রয়েছে ভিটামিন কে, জিংক ও ম্যাঙ্গানিজ।

যদি আপনি ২৮ গ্রাম কুমড়োর বীজ খান তাহলে আপনার শরীরের জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন তার ৪০ পার্সেন্ট পেয়ে যাবেন। ম্যাগনেসিয়াম ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

মাত্র ২৮ গ্রাম কুমড়োর বীজের প্রায় ২.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৪.টার্কি মুরগির মাংস

টার্কি মুরগির মাংস আয়রনসমৃদ্ধ সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর খাবার। সাদা টার্কি মুরগির চেয়ে ডার্ক টার্কি মুরগির মাংসে বেশি পরিমাণে আয়রন প্রোটিন থাকে। ডার্ক টার্কি মুরগির মাংসে জিংক, সেলেনিয়াম ও ভিটামিন বি এর কয়েকটি উপাদান রয়েছে যেগুলো সচরাচর লাল মাংসে পাওয়া যায়। 

টার্কি মুরগির মাংস খেলে মিটবে প্রোটিন ও আয়রনের চাহিদা।

১০০ গ্রাম ডার্ক টার্কি মুরগির মাংসে প্রায় ১.৪ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। অপরদিকে ১০০ গ্রাম সাদা টার্কি মুরগির মাংসে মাত্র ০.৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৫.কলিজা, মস্তিষ্ক ও হৃদপিন্ডের মাংস

কলিজার মাংস খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। সাধারণত মাংসের মধ্যে কলিজা, মস্তিষ্ক ও হৃদপিন্ডের মাংসে আয়রনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। সব ধরনের মাংসে ভিটামিন বি, কপার ও সেলেনিয়াম রয়েছে। তাই অর্গান মাংসে ও এই পুষ্টি উপাদানগুলো থাকে।

আরও পড়ুন নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার।

কলিজাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ। তাছাড়া কলিজাতে রয়েছে কোলিন নামের এক ধরনের উপাদান। কোলিন আমাদের মস্তিষ্ক ও লিভারের জন্য অনেক উপকারী একটি উপাদান। গর্ভাবস্থায় আয়রনের চাহিদা বেশি থাকে তাই গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন গরুর কলিজা খেতে পারলে ভালো।

১০০ গ্রাম গরুর কলিজাতে প্রায় ৬.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৬.সামুদ্রিক মাছ

সব ধরনের মাছেই আয়রন রয়েছে, তবে সামুদ্রিক মাছে আয়রনের পরিমাণ বেশি। মাছ আমিষের কারণে আমাদের কাছে পরিচিত হলেও এতে রয়েছে আমাদের শরীরের জন্য উপকারী আরও নানা পুষ্টি উপাদান।

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসিড এক ধরনের স্বাস্থ্যকর চর্বি যা সামুদ্রিক মাছে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হার্টের জন্য অনেক উপকারী। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখে। ফলে হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

এই স্বাস্থ্যকর চর্বি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। সমস্যা হলো সব জায়গায় সব সময় সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায় না। আমাদের দেশি মাছেও আয়রন রয়েছে। তাই আয়রন ও আমিষের জন্য প্রতিদিন দেশি মাছ খাওয়া উচিত।

১০০ গ্রাম সামুদ্রিক চিংড়িতে প্রায় ৩ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৭.শিম, মটরশুঁটি ও ডাল জাতীয় খাবার

সাধারণ মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ছোলা, সয়াবিন, শিম ইত্যাদি হল লেগুম জাতীয় খাবার। এই জাতীয় খাবার গুলোতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। শিম শীতকালে পাওয়া যায়। তবে ডাল জাতীয় খাবার গুলো সারা বছরই পাওয়া যায়। যেমনঃ ছোলা, মসুর ডাল, মুগ ডাল ইত্যাদি।

আয়রন ছাড়াও শিম ও ডাল জাতীয় খাবারে পাবেন পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ,ফাইবার ও ফোলেট।

ফাইবার শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমায়। আপনি যদি ওজন কমানোর ডায়েট খেতে চান তাহলে শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় খাবার গুলো খেতে পারেন। তাছাড়া এই জাতীয় খাবার গুলো খেলে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমে।

তবে মনে রাখবেন শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় খাবার থেকে ভালো পরিমাণে আয়রন পেতে টমেটো, সবুজ শাক ও সাইট্রাস ফলের সাথে খেতে হবে।

১৯৮ গ্রাম রান্না করা মসুর ডালে প্রায় ৬.৬ গ্রাম আয়রন থাকে।

৮.কুইনোয়া বা কাউন চাল

কাউন চাল হলো শস্যজাতীয় খাবার। অন্যান্য শস্য জাতীয় খাবারের তুলনায় কাউন চালে আমিষের পরিমাণ বেশি। কাউন চালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন থাকে।

আয়রন ছাড়াও ফোলেট, ম্যাগনেসিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ ও অন্যান্য পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার হলো কাউন চাল। তাই আয়রন ও প্রোটিনসহ উল্লেখিত পুষ্টি উপাদান গুলো পেতে কাউন চাল খেতে পারেন।

১৮৫ গ্রাম রান্না করা কাউন চালে প্রায় ২.২ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

৯.ডার্ক চকোলেট

ডার্ক চকোলেট নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি মজাদার খাবার। ডার্ক চকোলেটে রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ভালোর জন্য ছোট বড় সবাই ডার্ক চকোলেট খেতে পারেন।

এতে রয়েছে প্রিবায়োটিক ফাইবার। এই প্রিবায়োটিক ফাইবার আমাদের পেটে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজন। তাছাড়া ডার্ক চকোলেটে আয়রন, কপার ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে প্রচুর পরিমাণে।

ডার্ক চকোলেট কোলেস্টেরলের ভারসাম্য ঠিক রাখে যার ফলে হূদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। তবে সব ডার্ক চকোলেট সমান ভাবে তৈরি হয় না।

মাত্র ২৮ গ্রাম ডার্ক চকোলেটে ৩.৪ গ্রাম আয়রন থাকে।

১০.ফুলকপি

ফুলকপি একটি শীতকালীন সবজি তাই শীতকালে এর দেখা মেলে। এই সবজিটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে ও  ফাইবার।

তবে শাকসবজি বেশি সিদ্ধ করলে এর ভিটামিন কমে যায় তাই বেশি বেশি ভিটামিন পেতে কম সিদ্ধ শাকসবজি খেতে হবে।

২৩৪ গ্রাম ফুলকপিতে ১.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *