ওজন কমাবে সুপার ফুড চিয়া সিড। শুধু নিয়ম মেনে খেতে হবে।

ওজন কমানোর ডায়েট হিসেবে চিয়া সিড এর বেশ সুনাম রয়েছে। শরীরের ওজন কমাতে চাইলে ডায়েট কন্ট্রোল করা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনাকে বুঝে শুনে খাবার খেতে হবে। কোন খাবার খাওয়ার আগে তার ক্যালরির পরিমাণ, ফ্যাট, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে জানতে হবে।

চিয়া সিড বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদানে ভরপুর তাই এটি সুপার ফুড নামে খ্যাত। এই সুপার ফুড খেলে শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমে। তবে নিয়ম না মেনে চিয়া সিড খেলে তেমন কাজ হয় না। আর এই জন্য প্রথমে জানতে হবে ওজন কমাতে চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম গুলো সম্পর্কে।

চিয়া সিড এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর ফাইবার ও প্রোটিন। ওজন কমার পাশাপাশি শরীর তার প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাবে। ওজন কমাতে চাইলে চিয়া সিড এর সাথে অন্যান্য কম ক্যালরি ও বেশি আঁশযুক্ত খাবার গুলো নিয়ে একটা আদর্শ খাবার তালিকা‌ বানিয়ে নিন। আজ কাল স্বাস্থ্য নিয়ে অনেকেই সচেতন। পুষ্টিগুণ, উপকারিতা ও অপকারিতা জেনে বুঝে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করে। আশা রাখি তাদের জন্য আমাদের এই পোস্টটি উপকার আসবে।

চিয়া সিড কি?

ওজন কমাতে চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম।

চিয়া সিড হচ্ছে বীজ জাতীয় খুবই পুষ্টিকর একটি খাবার। এটি মিন্ট প্রজাতির সালভিয়া হিসপানিকা নামের উদ্ভিদের বীজ। মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোর মরুভূমিতে সালভিয়া হিসপানিকা বা চিয়া গাছ সবচেয়ে বেশি জন্মায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীন অ্যাজটেক এবং মায়ান সভ্যতায় চিয়া সিড ব্যাপক আকারে চাষ করা হতো এবং মেসো-আমেরিকানদের প্রধান খাদ্য ছিল। চিয়া সিড আকারে ছোট হলেও পানিতে ভেজালে ১২ গুন পর্যন্ত বাড়তে পারে। সাদা, কালো ও বাদামী রঙের বীজগুলো দেখতে অনেকটা তিলের ন্যায়।

চিয়া সিড কেন খাবেন?

চিয়া সিডে প্রচুর পরিমানে ওমেগা থ্রি থাকে যা আমাদের কার্ডিয়াক হেলথ এর জন্য খুবই উপকারী। ওমেগা থ্রি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমায় ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায়। যারা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর ঝুঁকিতে রয়েছে যদি প্রত্যেকদিন চিয়া সিড খান তাহলে ঝুঁকি অনেকটা কমবে। এতে রয়েছে ফাইবার, প্রোটিন, আয়রন ও ক্যালসিয়াম। আইবিএস, গ্যাস্ট্রিক ও অন্যান্য সমস্যার কারণে যারা দৈনিক শাকসবজি খেতে পারেনা তারা ফাইবারের জন্য চিয়া সিড খেতে পারেন।

তাছাড়া এটি পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ধারণ করে যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বিপাক ক্রিয়া দুর্বল হলে শরীরের ওজন বাড়াতে থাকে। চিয়া সিড খেলে বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি পায় ফলে ওজন কমে। তাই সপ্তাহে অন্তত তিন দিন চিয়া বীজ খাওয়া উচিত বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করে।

চিয়া সিড এর পুষ্টিগুণ

মাত্র ২৮ গ্রাম চিয়া সিড ১৩৮ ক্যালোরি ধারণ করে। চিয়া সিডে তার ওজনের ৬% পানি, ৪৬% কার্বোহাইড্রেট তার মধ্যে ৮৩% ফাইবার, ৩৪% ফ্যাট এবং ১৯% প্রোটিন থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম চিয়া বীজে পুষ্টি উপাদান থাকে:

  • চিনি: নেই
  • পানি: ৬%
  • ক্যালোরি: ৪৮৬
  • প্রোটিন: ১৬.৫ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট: ৪২.১ গ্রাম (যার মধ্যে রয়েছে ৩৪.৪ গ্রাম ফাইবার)
  • ফ্যাট: ৩০.৭ গ্রাম (যার মধ্যে ট্রান্স ফ্যাট ০.১৪ গ্রাম, স্যাচুরেটেড ৩.৩৩ গ্রাম, মনোস্যাচুরেটেড ২.৩১ গ্রাম, পলিঅনস্যাচুরেটেড ২৩.৬৭ গ্রাম)
  • ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড: ১৭.৮৩ গ্রাম
  • ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড: ৫.৮৪ গ্রাম

চিয়া বীজে আরো আছে ক্যালসিয়াম, জিংক, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। প্রতিদিন যারা নিয়মিত ব্যায়াম করে তাদের একটু বেশি প্রোটিন দরকার হয়। চিয়া বীজে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম যা আপনার এক্সট্রা প্রোটিনের পূরণ করবে। যারা গ্লুটেন মুক্ত খাবার খান তারা চিয়া বীজ নিঃসন্দেহে খেতে পারেন চিয়া বীজে গ্লুটেন নেই।

চিয়া সিড এর স্বাস্থ্য উপকারিতা

আমরা ইতোমধ্যে চিয়া সিড এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এখন জানবো চিয়া বীজ কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে অর্থাৎ চিয়া সিড এর স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে।

হজমক্রিয়া উন্নতিসাধন

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন। তবে বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী ফাইবারের প্রয়োজনীয় মাত্রা পরিবর্তিত হয়। সুস্থ থাকতে আমাদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলো খাওয়া প্রয়োজন। তেমনি একটি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার চিয়াসিড।

আরও পড়ুন টেস্টোস্টেরন হরমোন বৃদ্ধির নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।

চিয়া বীজে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। চিয়া বীজ অন্ত্রে ভিটামিন এবং খনিজ লবণের শোষণ বাড়ায়। এক কথায় চিয়া বীজ হজম শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।

শরীরের ওজন কমায়

ঘনঘন ক্ষুধা লাগা ও বেশি বেশি খাওয়ার ফলে শরীরের ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এ সমস্যার সমাধান দিবে চিয়া সিড। এটি বিপাক ক্রিয়া বাড়ানোর মাধ্যমে শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। তবে সাথে প্রচুর পরিমাণ পানি পান হবে। পানি কম খেলে হজমে সমস্যা গ্যাস্ট্রিক, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ করে চিয়া সিড

হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে।
ডায়াবেটিসের কারণ হলো রক্তে চিনি বা ব্লাড সুগার স্বাভাবিকের চাইতে বেড়ে যাওয়া। চিয়া সিড রক্তে চিনি নিয়ন্ত্রণে রাখে ফলে ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি হ্রাস পায়।

এতে রয়েছে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড, ক্যাফেইক অ্যাসিড, মাইরিসেটিন, কোয়েরসেটিন এবং কেমফেরল নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো হার্ট ও লিভারকে সুরক্ষা দেয়। ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড রক্তচাপ এবং ক্যাফেইক অ্যাসিডের পেটের প্রদাহ বা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা কমায়।

আমাদের শরীরে দুই ধরনের কোলেস্টেরল থাকে।HDL বা ভালো কোলেস্টেরল এবং LDL বা খারাপ কোলেস্টেরল। হার্ট ভালো রাখতে হলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিয়া সিড এর ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড খারাপ কোলেস্টেরল কমায়। নিয়মিত চিয়া বীজ খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমবে এবং ভালো কোলেস্টেরল বাড়বে ফলে হার্ট সুস্থ থাকবে ও হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।

ওজন কমাতে চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম

বর্তমানে ওজন কমাতে চিয়া সিড এর কার্যকারিতা নিয়ে নানা আলোচনা পর্যালোচনা চলছে। ব্যবহারকারীর অনেকেই সন্তোষজনক ফলাফল জানিয়েছে। অস্বাস্থ্যকর ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে মেদ জমে যা দূর করতে ব্যায়ামের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করতে হবে।

প্রতিদিন ২০ গ্রামের বেশি চিয়া সিড খাওয়া উচিত নয়। ওজন কমানোর জন্য ২০ গ্রাম হলো একটি আদর্শ মাত্রা। এই সিডস খাওয়ার কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই। আপনি আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী যেইভাবে খুশি খেতে পারেন। ইসবগুলের ভূষির মত ১ গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে সরাসরি খাওয়া যায়। সকালের নাস্তায় দুধ বা দইয়ের সাথে, রুটির সাথে অথবা এক গ্লাস পানির সাথে আপনার যা খুশি।

  • রুটি, দুধ, দই, পোরিজ, স্মুদি, জুস বা পুডিংয়ের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।
  • ওজন কমানোর জন্য এক গ্লাস পানিতে এক চামচ চিয়া সিডস মিশিয়ে খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায়। একই নিয়মে রাত্রে ঘুমানোর আগে খেতে হবে। এই নিয়মে প্রতিদিন খেলে ওজন কমার পাশাপাশি ভালো ঘুম হবে। কারণ এর ওমেগা থ্রি ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
  • সালাদের সাথে মিশিয়েও খেতে পারেন।

চিয়া সিড কিভাবে ওজন কমায়

অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণে শরীরের ওজন বাড়ে। ফাইবার বা উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার গুলো খেলে তৃপ্তি বোধ হয়। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে সহজে ক্ষুধা লাগতে দেয় না এবং ঘনঘন ক্ষুধা লাগার সমস্যা দূর করে। ফলে ঘন ঘন খাওয়ার অভ্যাস দূর হয়।

পেট বেশিক্ষণ ভরা রেখে বারবার বেশি বেশি করে উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত যুক্ত খাবার গুলো খাওয়া থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে উচ্চ আঁশযুক্ত চিয়া বীজ ওজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাছাড়া ফাইবার আমাদের অন্ত্র থেকে পানি শোষণ করে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন দানাদার বা বীজ জাতীয় খাবার গুলো খেলে একটু বেশি পিপাসা লাগে। ফাইবার অন্ত্র থেকে পানি শোষণ করার কারণে এইটা হয়। পর্যাপ্ত পানি পান করতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে চিয়া বীজ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অবদান রাখে।

চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

খুব বেশি পরিমাণে চিয়া সিড খেলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত সব ধরনের সিড বা বীজ জাতীয় খাবারগুলো খেলে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হয়। যদি পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয় তাহলে ফাইবার অন্ত্র থেকে পানি শোষণ করার ফলে শরীরের পানি শূন্যতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া নিম্ন রক্তচাপ, পেট ফাঁপা , পেটে গ্যাস, পেটে ব্যথা এ ধরনের কিছু উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।

চিয়া সিড সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)

চিয়া সিড এর দাম কত?
চিয়া সিড সব জায়গায় একই দামে বিক্রি হয় না। অনলাইনে কিনতে গেলে কিছুটা বেশি টাকা লাগবে। আমরা বিভিন্ন অনলাইন সপ থেকে দাম জেনেছি। আপনি যদি অনলাইন থেকে কিনতে চান তাহলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
আপনার পার্শ্ববর্তী মুদির দোকান বা সুপার মার্কেটে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। কেননা দেখেশুনে গুণগত মান বিচার বিশ্লেষণ করে কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

চিয়া সিড খাওয়ার সময় কখন?
যেকোনো সময় খেতে পারেন। Constipation প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় সকাল বেলা খালি পেটে এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে এবং রাতে ঘুমানোর আগে একই নিয়ম খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। নাস্তার সাথেও সময় খেতে পারেন আপনার ইচ্ছা।

চিয়া সিড এর বাংলা নাম কি?
এর বাংলা নাম চিয়া সিড বা চিয়া বীজ অন্য কোন নাম নেই। অনেকের কাছে এটি আবার সুপার ফুড নামে পরিচিত। এটি আমাদের দেশীয় কোন খাবার না। তাই এটি চিয়া সিড নামেই আমাদের কাছে পরিচিত।

চিয়া সিড এর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?
পরিমিত মাত্রায় খেলে তেমন কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। যাদের ফুড এলার্জি আছে হয়তো তাদের এলার্জি চুলকানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। টাইপ-১ রোগীদের গ্লুকোজ মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের চিয়া বীজ অল্প পরিমাণে খেতে হবে অথবা না খাওয়াই ভালো।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *