পেটের গ্যাস কমানোর কিছু কার্যকরী টিপস।

মাঝে মাঝে পেটে কিছুটা গ্যাস হওয়া স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে। এই স্বাভাবিক নিয়মটা অস্বাভাবিক হয় যখন পেটে অতিরিক্ত গ্যাস হয়। পেটে গ্যাস জমলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয় বিশেষ করে পেটে ও পিঠে ব্যথা। বারবার পেটে অতিরিক্ত গ্যাস হলে ধরে নিতে হবে সেটা গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল ডিজিজ বা পরিপাকতন্ত্রের কোন রোগের কারণে হচ্ছে। তাই কোনক্রমেই অবহেলা করা উচিত হবে না।

এই পোস্টে পেটে গ্যাস কেন হয়, এর লক্ষণ ও করণীয় বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছ। আপনাদের উপকারে আসবে বলে আশা রাখি। পেটে অতিরিক্ত গ্যাসের কারণে গ্যাসের ব্যথা বা গ্যাস্ট্রাইটিস, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হতে হতে পারে। গ্যাসের ব্যথা হলে ব্যথা দূর করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাই। বিশেষজ্ঞদের মতে এক নাগাড়ে দীর্ঘ দিন গ্যাসের ওষুধ খেলে সেটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

পেটে গ্যাস হওয়ার কারণ

দ্রুত পেটের গ্যাস কমানোর ঘরোয়া উপায়।

আমার যে খাবার খাই তার সবটুকু ক্ষুদ্রান্ত্র হজম হয় না। খাদ্যের হজম না হওয়া অংশটুকু বৃহদান্ত্রে আসলে সেখানে হজম ক্রিয়া শুরু হয়। আর এই কারণেই পেটে গ্যাস হয়। বদহজম বা পেটে অন্য কোন সমস্যা থাকলেও গ্যাস হয়।

পেট ভরে অতিরিক্ত খাবার খেলে অথবা নির্দিষ্ট কোন খাবারের কারণে পেটে গ্যাস হতে পারে। তাছাড়া কোলনের ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তনের কারণে তলপেটে গ্যাস হতে পারে।

খাবারের কারণে পেটে গ্যাস

নির্দিষ্ট কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো খেলে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস হয়। এই খাবারগুলো খেলেই যে সবার পেটে গ্যাস হবে বিষয়টা এমন না। কারো কারো ক্ষেত্রে এই খাবারগুলো পেটে অতিরিক্ত গ্যাসের কারণ হয়। খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মটরশুটি, মসুর ডাল ও ছোলা
  • কিছু সবজি যেমন: বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি ও ব্রাসেলস স্প্রাউটস ইত্যাদি।
  • ডেইরি প্রোডাক্ট অর্থাৎ দুধ দিয়ে বানানো সব ধরনের খাবার।
  • তেল, চর্বি ও চিনি দিয়ে বানানো কোন খাবার।
  • সব ধরনের জাঙ্ক ফুড যেমন: ফাস্টফুড ও প্রসেসিং ফুড।
  • কার্বনেটেড বেভারেজ অর্থাৎ এনার্জি ড্রিঙ্কস।

পেটের গ্যাস কমাতে ও পেট ঠান্ডা রাখতে অনেকেই এনার্জি ড্রিংস খায়। এটা সম্পূর্ণ একটা ভুল ধারণা ধারণা। কার্বনেটেড বেভারেজ নিজেই গ্যাস তৈরি করে। এনার্জি ড্রিংস খেলে পেটের গ্যাস আরো বাড়বে।

হজমের রোগের কারণে পেটে গ্যাস

হজমের রোগের কারণে পেটে অত্যধিক গ্যাস হয়। এই রোগে গুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • সিলিয়াক ডিজিজ
  • কোলন ক্যান্সার
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • গ্যাস্ট্রোপেরেসিস
  • ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া
  • ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স
  • ওভারিয়ান ক্যান্সার
  • ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম
  • ইনটেস্টাইনাল অবসট্রাকশন
  • পেনক্রিয়েটিক এনজাইমের অপর্যাপ্ততা
  • গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ

এই সবগুলি হলো পেটের হজমের সমস্যা জনিত রোগ। তাই আপনার পেটে যদি সব সময় অতিরিক্ত গ্যাস হয় অবহেলা না করে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অতিরিক্ত গ্যাস এর লক্ষণ

সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ঢেকুর উঠা
  • পেট ফাঁপা
  • পেটে ব্যথা ও অস্বস্তি বোধ করা

কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেটে অতিরিক্ত গ্যাসের সাথে অন্যান্য উপসর্গ থাকতে পারে। যেমন:

  • ডায়রিয়া
  • হার্ট বার্ন
  • বদহজম
  • কোষ্ঠকাঠিন্য

পেটের গ্যাস কমানোর উপায়

অতিরিক্ত গ্যাস হতে মুক্তি পেতে চাইলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন হবে। তার আগে খুঁজে বের করতে হবে কি কারণে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস হচ্ছে। পেটে গ্যাস হলে উপসর্গগুলো উপশম করতে আমার যে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাই সেটা সাময়িকভাবে গ্যাস দূর করে। সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য এর কারণ খুঁজে বের করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরোয়া প্রতিকার গুলো প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। আমি এখানে কতগুলো টিপস সম্পর্কে আপনাদের জানিয়েছি এগুলো অতিরিক্ত গ্যাস উপশমে সাহায্য করবে।

আপেল সিডার ভিনেগার

পেটের গ্যাস দূর করার ঘরোয়া প্রতিকারের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আমি আপেল সিডার ভিনেগারের কথা বলবো। আপেল সিডার ভিনেগারের একটা বিশেষ গুণ রয়েছে। পর্যাপ্ত পাচক এনজাইমের অভাবে হজমে সমস্যা হয় যার ফলে পেটে গ্যাস হয়। পর্যাপ্ত পাচক রস তৈরি করতে সাহায্য করবে আপেল সিডার ভিনেগার।

আরো পড়ুন কম ক্যালরি যুক্ত খাবারের তালিকা। ওজন কমানোর আদর্শ খাবার।

এই ভিনেগার পাচক এনজাইমের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং পেটের গ্যাস দ্রুত কমিয়ে স্বস্তি বোধ দেয়। শুধু গ্যাস নয় গ্যাসের কারণে পেটে ও পিঠে ব্যথা কমায় আপেল সিডার ভিনেগার।

এক গ্লাস পানিতে এক টেবিল চামচ আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে নিন। এই শরবত প্রতিবার খাবার খাওয়ার আগে পান করলে পেটের গ্যাস ও ব্যথা দুটোই দূরে থাকবে। সতর্ক থাকতে হবে আপেল সিডার ভিনেগার যেন দাঁতে লেগে না থাকে। তাই ভালোভাবে কুলি করে নিতে হবে তা না হলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ক্যামোমাইল চা

হজমের সমস্যা, পেটে গন্ডগোল, পেটে জমে থাকা গ্যাস এবং পেট ফাঁপা থেকে মুক্ত থাকতে নিয়মিত ক্যামোমাইল চা খেতে পারেন। এই চা পেটে গ্যাস হতে দেয় না। তাই কফি, চিনি দিয়ে বানানো সাধারণ চায়ের পরিবর্তে ক্যামোমাইল চা পানের অভ্যাস করুন।

পেপারমিন্ট

পেপারমিন্টের রয়েছে বহু স্বাস্থ্য উপকারিতা। পেপারমিন্ট দিয়ে বানানো চা পেটে গ্যাস দূর করতে খুবই কার্যকর। একেবারে পেট ফুলে গেলে এই চা খেলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। এই চা পান করলে পেট ফাঁপা সহ ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোমের অন্যান্য উপসর্গ দূর হবে। আর আপনি অস্বস্তি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন। ১ কাপ চা বানাতে কতটুকু পেপারমিন্ট লাগবে সেটা জানতে পেপারমিন্ট সাপ্লিমেন্ট বোতলের গায়ে লেখা নির্দেশিকা থেকে জেনে নিন।

প্রতিবার খাবার খাওয়ার আগে এক কাপ পেপারমিন্ট চা পান করলে খাওয়ার পর পেটে গ্যাস হবে না। পেপারমিন্ট আয়রন ও ওষুধ শোষণে বাধা দেয় এজন্য ওষুধ খাওয়া কালে পেপারমিন্ট চা খাওয়া উচিত হবে না। কিছু কিছু লোকের এই চা পান করলে আবার হার্টবার্ন হয় তাই কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে।

খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খান

তাড়াহুড়ো করে খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে না খেলে বদহজম হয়। বদহজম হলে পেটে গ্যাস, ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। তাই আস্তে আস্তে ভালোভাবে খাবার চিবিয়ে খেতে হবে।

পেটের গ্যাস কমাতে মৌরি বীজ

পেটের গ্যাস কমাতে মৌরি বীজ একটি কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিকার। এক চা চামচ মৌরি বীজ রুখে দিতে পারে পেটের গ্যাস। তবে খেয়াল রাখবেন গর্ভবতী ও মায়ের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে এমন মায়েদের জন্য মৌরি বীজ খাওয়া অনুচিত।

অন্যান্য টিপস

নিয়মিত ব্যায়াম, প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এবং বদহজম দূর করা পেটের অতিরিক্ত গ্যাস দূর করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন খেলে গ্যাসের সমস্যা বাড়তে পারে তাই সঠিক মাত্রায় প্রোটিন খাওয়া উচিত। উপরে অত্যাধিক গ্যাস সৃষ্টিকারি খাবার গুলো সম্পর্কে জানানো হয়েছে যথাসম্ভব এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন।

চিনি, ডেইরি প্রোডাক্ট ও তেল চর্বি জাতীয় খাবার একেবারে বাদ দিতে হবে। গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার গুলো যদি আপনার পেটে সহ্য না হয় তাহলে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলুন। ধূমপান, তামাক সেবন ও অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে বাদ দিতে হবে। একটা স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় প্রবেশ করুন যাতে আপনার শরীর এবং মন উভয়ই ভালো থাকে। নিজেকে প্রফুল্ল রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *