মাইগ্রেন এর ব্যাথা কমানোর উপায়।

জীবনে একবার মাথাব্যথা হয়নি এই ধরনের মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে। মাথাব্যথার ভিবিন্ন কারণ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে মাইগ্রেন একটি। মাইগ্রেন সম্পর্কে অনেকের ধারণা না থাকলেও আধকপালি মাথাব্যথা সম্পর্কে অনেকেই জানেন বা এই আধকপালি মাথাব্যথায় অনেকেই ভুগে থাকেন।

আসলে এই আধকপালি মাথাব্যথাই হলো মাইগ্রেন। মাইগ্রেন বা আধকপালি মাথাব্যথা মাথার একপাশ থেকে শুরু হওয়ার কারনে এধরণের নাম দেওয়া হয়েছে। এই পোস্টে মাইগ্রেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

মাইগ্রেন কেন হয়?

মাইগ্রেন থেকে মুক্তির উপায়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মাইগ্রেন কেন হয় বা মাইগ্রেন হওয়ার কারণ কি তা এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে বের করতে পারেনি। এই সম্পর্কে গবেষণা চলছে। তবে মাইগ্রেন হওয়ার কিছু কারন সম্পর্কে অনুমান করা হয়।

তাহলে আসুন জেনে নেই কি কারন রয়েছে মাইগ্রেন হওয়ার পিছনে। 

বংশগত বা জেনেটিক কারণ: সবচেয়ে বেশি মানুষ মাইগ্রেন পায় জেনেটিক বা বংশগত কারনে। সাধারণত মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫% বংশগতভাবে মাইগ্রেন পায় বলে মনে করা হয়।

পরিবেশগত কারণ: পরিবেশগত কারণেও মাইগ্রেন হতে পারে। পরিবেশের বিভিন্ন অবস্থা যেমন: ঠান্ডা,গরম, আর্দ্রতা ইত্যাদি কারনে মাইগ্রেন হতে পারে।

ট্রাইজেমিনাল নার্ভে সমস্যার কারনে: আমাদের মাথার যে ট্রাইজেমিনাল নার্ভ রয়েছে তার আয়নিক চ্যানেলগুলোতে সমস্যার কারণে মাইগ্রেন হতে পারে। 

হরমোনের পরিবর্তন: হরমোনের পরিবর্তন এর কারনেও মাইগ্রেন হতে পারে। যেমন: এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টোরন হরমোনের উঠানামার কারণে মাইগ্রেন হয়।গর্ভাবস্থায়, ঋতুস্রাব ও মেনোপজে অনেক মহিলারা মাইগ্রেনে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। 

কতগুলো ট্রিগার রয়েছে যেগুলো মাইগ্রেনকে উৎসাহিত করে। এই ট্রিগারগুলো সম্পর্কেও আমাদের জানা দরকার। কারণ এই ট্রিগারগুলো সম্পর্কে জানতে পারলে আমরা কিছুটা হলেও মাইগ্রেন প্রতিরোধ করতে পারব। এই ট্রিগার গুলোর মধ্যে রয়েছে। 

মিষ্টি জাতীয় খাবার: খুব বেশি পরিমানে মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে আপনার মাইগ্রেনর সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়। গ্লুকোজ এর মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে রক্তে অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। যার ফলে রক্তের গ্লুকোজ এর মাত্রা কমতে থাকে।

আরও পড়ুন হাইপার থাইরয়েডিজম থেকে মুক্তির উপায়।

রক্তে সুগারের এই উঠানামার কারনে মাইগ্রেন এর সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই মাইগ্রেন প্রতিরোধে মিষ্টিজাতীয় খাবারগুলো খুব বেশি পরিমানে খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। 

দীর্ঘ সময় খালিপেটে থাকা: খালিপেটে মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যথা বেড়ে যায়। কারণ খালিপেটে গ্যাস্ট্রিক হয়। আর এই গ্যাসট্রিকের কারনে মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথা বেড়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘসময় খালিপেটে থাকার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।

মানসিক চাপ: মানসিক চাপ মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যথার একটি অন্যতম কারণ। মানসিক চাপ, যথেষ্ট না ঘুমানো, ঠিকঠাক মতো খাবার না খাওয়া মাইগ্রেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। 

অতিরিক্ত শব্দ: অতিরিক্ত আওয়াজ, হৈচৈ, হট্টগোল এবং উজ্জ্বল আলো মাইগ্রেন এর সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। 

অতিরিক্ত রোদে চলাফেরা: দীর্ঘসময় রোদে হাটাচলা বা কাজকর্ম করলে মাইগ্রেন হতে পারে। তাছাড়া খুব ঠান্ডা বা গরম আবহাওয়ার কারণেও মাইগ্রেনজনিত সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। 

বেশি পরিমানে ক্যাফেন গ্রহণ: খুব বেশি পরিমানে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাইগ্রেন জনিত সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ করার অভ্যাস থাকলে তা হঠাৎ ছেড়ে দিলে মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যথা বেড়ে যায়। তাই চা বা কফি পানের অভ্যাস থাকলে তা আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। অনেক সময় চকলেট, আইস্ক্রিম, খুব ঠান্ডা বা খুব গরম খাবার খাওয়ার ফলে মাইগ্রেন হতে পারে। 

মাইগ্রেন এর লক্ষণ

মাইগ্রেন এর প্রধান লক্ষণ হলো মাথার একপাশে ব্যথা। কিন্তু মাথাব্যথা শুরু হওয়ার দুই থেকে তিন দিন আগে মাইগ্রেন এর কিছু উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। এই উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে: 

  • ক্ষুধা বৃদ্ধি পাওয়া
  • বিষন্নতা 
  • ক্লান্তি বোধ হওয়া বা নিজকে দুর্বল বোধ করা
  • ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়া
  • সবকিছুতেই বিরক্ত লাগা বা কোন কাজে মন বসে না

সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে আরও কিছু লক্ষণ প্রকাশ পাবে। যেমন:

  • কথা বলতে অসুবিধা বা কথাগুলো অস্পষ্ট বলে মনে হয়।
  • মুখে, বাহু বা পায়ে ঝিনঝিন করতে পারে 
  • সাময়িক ভাবে দৃষ্টি শক্তি কমে যেতে পারে অর্থাৎ মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই চোখে কম দেখতে পারেন। 

এর পরবর্তী পর্যায়ে অর্থাৎ মাইগ্রেনে পুরো আক্রান্ত হলে যে ধরনের লক্ষণগুলি প্রকাশ পাবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: 

  • আলো বা শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া। অর্থাৎ মাইগ্রেন পুরো আক্রান্ত হলে আলো বা শব্দ আপনার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হবে।
  • বমি বমি ভাব হবে। এমনকি বমি পর্যন্ত হতে পারে। আর বমি হলে ব্যথা অনেকটা কমে যাবে।
  • মাথা ঘোরানো অনুভূতি এবং মনে হতে পারে এই বুঝি জ্ঞান হারাবো।
  • মাথার একপাশ থেকে ব্যথা শুরু হবে।

এগুলো হলো মাইগ্রেন এর লক্ষণ। তাই এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে একজন ডাক্তার দেখানো উচিৎ।

মাইগ্রেন থেকে মুক্তির উপায়

মাইগ্রেন প্রতিরোধে আপনার লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনতে হবে। মাইগ্রেন বিকাশে সাহায্যে করে এমন কতগুলো ট্রিগার রয়েছে। এই ট্রিগার গুলোকে মাথায় রেখে আমাদের লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রা পরিচালনা করতে হবে। মাইগ্রেন প্রতিরোধে আলোচিত শর্তগুলো মেনে চলা উচিৎ। শর্তগুলো হলো: 

  • শান্ত ও অন্ধকার জায়গায় অবস্থান কর‍তে হবে
  • অ্যালকোহল বা অ্যালকোহল যুক্ত পানীয়, চা,কফি বা ক্যাফেইন যুক্ত পানীয়, মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাদ্য,চকলেট, এই  খাবারগুলো খাওয়া যাবে না।
  • টেনশন মুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। 
  • রোদে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।

মাইগ্রেনের ব্যথা কমানোর উপায়

মাইগ্রেন এর চিকিৎসা সাধে মাইগ্রেন এর ধরনের উপর নির্ভর করে। জটিল মাইগ্রেন এর চিকিৎসা দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাইগ্রেনকে হালকা ভাবে নেওয়া ঠিক নয়। তাই মাইগ্রেন এর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্র একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিৎ। 

তবে ডাক্তারের নিকট যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাইগ্রেন এর উপসর্গগুলোকে কমাতে আপনি ওভার দ্যা কাউন্টার (ওটিসি) ওষুধ সেবন করতে পারেন। যেমন: 

  • মাথাব্যথার জন্য ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন।
  • বমির জন্য এন্টি-ইমেটিক ওষুধ। 
  • মাথা ঘোরানোর জন্য এন্টিভার্টিগো ওষুধ। 

যাইহোক কোন ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত সেবন করা উচিৎ নয়। একজন ডাক্তার আপনার বয়স, ওজন এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকে। তাছাড়া কোন ওষুধের প্রতি আপনার অতি সংবেদনশীলতা থাকতে পারে। তাই নিজ দায়িত্বে ওষুধ সেবন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *