গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগীর খাদ্য তালিকা।

আলসার কথাটি বলা যত সহজ রোগটি কিন্তু তত সহজ সরল নয়। আলসার রোগে আক্রান্ত হলে জটিল জটিল সব লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়। গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। পেপটিক আলসার থেকে ইন্টেস্টাইনাল পারফোরেশন অর্থাৎ পাকস্থলীতে ছিদ্র হয়ে যেতে পারে। এক কথায় সময় মতো ভালো চিকিৎসা না হলে নানা ধরনের জটিল সমস্যা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে এই রোগে।

আলসার রোগের সবচেয়ে কমন কারণ হলো হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। খাবার হজমে সাহায্য করে অম্লীয় পাচক রস। হজমি রস বা পাচক রস অম্লীয় হওয়ায় এটি পাকস্থলীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কথা। কিন্তু মিউকোসাল স্তর নামের একটি আবরণ পাকস্থলীর প্রাচীরকে অম্লীয় পাচক রস থেকে রক্ষা করে।

হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি (H.Pylori) ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলীর মিউকোসাল স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে পাকস্থলীর প্রাচীরে ক্ষত বা আলসার হয়। এই আলসারকে আমরা পেপটিক আলসার বা পেটের আলসার বলি। নন-স্টেরয়েড অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ হলো এক ধরনের ব্যথা নাশক ওষুধ। দীর্ঘদিন এই ধরনের ব্যথা নাশক ওষুধ খেলে পেটে ক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মদ্যপান ও ধূমপানকে পেটের আলসার রোগের আরো একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দ্রুত আলসার নিরাময়ে খাবারে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এই রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে এমন সব ধরনের খাবার খেতে হবে। আর আলসার থেকে সুস্থ হতে বাঁধাদানকারি সব ধরনের খাবার বাদ দিতে হবে।

আলসার রোগীর খাদ্য তালিকা

গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগীর খাদ্য তালিকা

জিঙ্ক এবং সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে আলসার দ্রুত নিরাময় হয়। যে খাবারগুলো পেটে অ্যাসিড বৃদ্ধি করে সেগুলো খাওয়া যাবেনা। পেটে আলসার বা ক্ষত হলে নানা উপসর্গ। যেমন: বমি ও বমি বমি ভাব, পেটে ও বুকে ব্যথা, পেট ফাঁপা, হার্ট বার্ন বা বুকে জ্বালাপোড়া ইত্যাদি। আজকের তালিকায় যে খাবারগুলো রয়েছে, এই রোগের উপসর্গগুলো থেকে মুক্তি দিতে পারে। আলসার নিরাময়ে সাহায্যকারী খাবারগুলো হল:

তাজা ফল মূল

তাজা ফলে পাওয়া যায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার, পলিফেনল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য তাজা ফল অত্যন্ত উপকারী। নানা পুষ্টি উপাদানে ভরপুর ফল খেলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

আপেল, আঙ্গুর, ডালিম ও অন্যান্য উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ ফলগুলো এই রোগ নিরাময়ে বেশ কার্যকর। মিষ্টি আলু, মুলা, গাজর ইত্যাদি মূল জাতীয় সবজি গুলি হজম শক্তি বৃদ্ধি করে ও গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা কমায়। বিশেষ করে মিষ্টি আলু ও গাজরের মত রঙ্গিন মূল প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ। ভিটামিন-এ পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া কমাতে বিশেষভাবে সহায়তা করে।

শাকসবজি

সবুজ, লাল ও কমলা রঙের শাকসবজি এবং ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি ক্রুসিফেরাস শাকসবজি অতি প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। শাকসবজিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে সহায়তা করে।

সব ধরনের শাকসবজিতে রয়েছে ফাইবার। শাকসবজির এই ফাইবার খাদ্য হজমে সহায়তা করে, আলসার নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং উপসর্গগুলো দূর করে। ফুলকপি ও ব্রকলিতে রয়েছে সালফোরাফেন নামের এক ধরনের উপাদান। এই উপাদানটি আলসার সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে।

ডাল ও বীজ জাতীয় খাবার

মসুর ডাল, শুকনো মটরশুটি, মটর, বাদাম ইত্যাদি দানাদার খাবার ফাইবারের একটি সেরা উৎস। দ্রুত আলসার নিরাময়ে প্রয়োজন জিঙ্ক। ডাল ও বীজ জাতীয় খাবারে রয়েছে জিঙ্ক। এক কথায় বলতে গেলে, তাজা ফলমূল, সব ধরনের শাকসবজি, ডাল ও বীজ জাতীয় খাবারে রয়েছে পেপটিক আলসার নিরাময়ে সাহায্যকারী উপাদান।

টক দই

H.pilory ইনফেকশনের কারণে পেটে ক্ষত হলে চিকিৎসকরা তা নির্মূলের জন্য ওষুধ প্রেসক্রিপশন করে থাকে। ওষুধ খেলে দেখা দেয় নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। ওষুধের পাশাপাশি প্রোবায়োটিক সেবনে ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক কমে যায়।

দইয়ে রয়েছে প্রোবায়োটিক ও অন্যান্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া যা এই রোগ হতে দ্রুত মুক্তি পেতে সহায়তা করার পাশাপাশি হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

মধু

দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে মধু। সৃষ্টিকর্তা মধুকে দিয়েছেন অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা। তাই মধু খেলে পেটের এই রোগ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়।

ভিটামিন সি

দ্রুত সুস্থ হতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি। তাই খেতে হবে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার। তবে টমেটো, টমেটোর সস এবং সাইট্রাস ফলগুলো অল্প পরিমাণে খেতে হবে। এই ধরনের ফলগুলো খেলে অনেকের হাইপার এসিডিটি ও গ্যাস হয়। সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে তাই ভিটামিন সি পেতে সবুজ শাকসবজি খেতে পারেন।

এক কথায় স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, আপেল, ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, চেরি, মরিচ, গাজর, ব্রকলি, রাস্পবেরি, শাকসবজি, মধু অলিভ অয়েল, প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: দই, কেফির, মিসো, স্যুরক্রট এবং কম্বুচা) পাকস্থলীর ক্ষত নিরাময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আলসার রোগীর জন্য নিষিদ্ধ খাবার

আলসার রোগীদের জন্য নিচের খাবার গুলো খাওয়া নিষেধ।

ক্যাফিন ও কার্বনেট যুক্ত পানীয়

ক্যাফিন যুক্ত পানীয় যেমন কফি এবং কার্বনেট বা কোমল পানীয় পেটের ক্ষত বৃদ্ধি করে। এই ধরনের খাবার ও পানীয় পেটে অ্যাসিড সৃষ্টি করে। ফলে হাইপার অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। তাছাড়া হাইপার অ্যাসিডিটি বা পেটে অ্যাসিড বাড়লে পেটে অস্বস্তি ও প্রদাহ হতে পারে। তবে খেতে পারেন ডাবের পানি, গ্লুকোজের পানি, টক দই, গ্রিন টি, ভেষজ চা ইত্যাদি।

ঝাঁঝালো মসলা ও চর্বিযুক্ত খাবার

মসলাযুক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবেনা ।অত্যাধিক তেল, ঝাল ও মসলাযুক্ত ঝাঁঝালো খাবার গুলো খেলে পেটে ক্ষত আরও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া চিনি দিয়ে বানানো খাবার, পেস্ট্রি কেক, ভাজাপোড়া খাবার ও ক্রিম যুক্ত খাবার খাওয়া যাবেনা।

পেটে গ্যাস ও অ্যাসিড সৃষ্টিকারী খাবার

পেটে গ্যাস হয় এমন ধরনের খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে। পেট ফাঁপা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই বেশ কয়েক ধরনের খাবার যেমন: ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, শালগম, ডাল ভাজা, শুকনো মটর ভাজা ইত্যাদি খাবার বাদ দিতে হবে।

টমেটো, সাইট্রাস ফল, যেমন লেবু, কমলা, আঙ্গুর, জাম্বুরা ইত্যাদি পেটে অ্যাসিড করে। খাদ্য তালিকা হতে বাদ দিতে হবে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, যেমন সাদা রুটি, সাদা ভাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশস্য।

অ্যালকোহল, তামাক ও ধূমপান

মদ্যপান ও অ্যালকোহল যুক্ত সব ধরনের পানীয় বর্জন করতে হবে। মদ্যপানের ফলে অন্ত্রের মিউকোসাল স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফলে পেটে ক্ষত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাছাড়া মিউকোসাল স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পেটে যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হয়।

আরো পড়ুন আইবিএস রোগীর খাবার তালিকা।

চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধূমপান সহ সব ধরনের তামা জাতীয় দ্রব্য। ধূমপান ও যেকোনো ধরনের তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবনে বারবার পেপটিক আলসার দেখা দেয়। তাই মদ্যপান, ধূমপান ও সব ধরনের তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকুন।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ

কারো কারো পেটের লক্ষণগুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকে অর্থাৎ কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সবচেয়ে কমন লক্ষণ হল পেটে বা বুকের কোন স্থানে ব্যথা যা অনেকটা বদহজম জনিত ব্যথার মতো। অন্যান্য লক্ষণ উপসর্গ গুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • খাবার গিলতে অসুবিধা
  • খাওয়ার পরে অস্বস্তি বোধ করা
  • শরীরের ওজন কমাতে থাকা
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • ডায়রিয়া

খুব দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হবে যদি রোগীর-

  • রক্ত বমি হয়
  • কালো বা রক্তাক্ত মল ত্যাগ হয়
  • ক্রমাগত বমি অথবা বমি বমি ভাব হয়

চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

সর্বোত্তম চিকিৎসার জন্য প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে কি কারনে হয়েছে।

যদি বেশি বেশি NSAIDs বা নন স্টেরোয়েড অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ড্রাগ জাতীয় ব্যাথা নাশক ওষুধ সেবনের ফলে পেটে ক্ষত হয় তাহলে এই ধরনের ওষুধ সেবন বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

এইচ পাইলোরি ইনফেকশনের কারণে পেটে আলসার হলে সাধারণত একজন চিকিৎসক প্রোটন পাম্প ইনহেবিটর অর্থাৎ পিপিআই এবং অ্যান্টিবায়োটিক একসাথে পেসক্রিপশন করে থাকেন।

জিংক, সেলেনিয়াম, প্রোটিন, ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবারগুলো এই রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। আমাদের শরীরের জন্য সব ধরনের পুষ্টির প্রয়োজন রয়েছে। তাই সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। যদি কোন খাবার পেটে গ্যাস, বদহজম ও অ্যাসিড বৃদ্ধি করে বলে মনে হলে তা খাওয়া যাবেনা।

প্রক্রিয়াজাত খাবার, মদ্যপান, অ্যালকোহল যুক্ত পানীয়, কার্বনেট যুক্ত কোমল পানীয়, ধূমপান ও সব ধরনের তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকতে পারলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *