আইবিএস রোগীর খাবার তালিকা। আইবিএস থেকে মুক্তির উপায়।

আইবিএস হচ্ছে একটি রোগ যা কতগুলো উপসর্গের সমষ্টি। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগ। মানসিক চাপের সাথে আইবিএস এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানসিক চাপ বাড়লে আইবিএস এর উপসর্গ গুলো বাড়ে। তাই আইবিএস নিয়ন্ত্রণে মানসিক চাপ মুক্ত থাকা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা পেটের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগে। যেমন: পেট ফাঁপা, আমাশয়, বদহজম, অনিয়মিত পায়খানা, কখনো পাতলা পায়খানা আবার কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য পর্যায়ক্রমে চলতে থাকা এই রোগের উপসর্গ। আইবিএস হলো ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগের এর সংক্ষিপ্ত রূপ। 

ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের পাশাপাশি উপযুক্ত খাবার তালিকা তৈরি করে এবং সেই অনুযায়ী খাবার খেলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সহজ হয়। এখানে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে কারণ হলো আইবিএস একটি ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ। তবে দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারায় কিছু পরিবর্তন সব মিলিয়ে অনেকেই এই রোগ থেকে ভালো হয়েছে।

আইবিএস রোগীর খাবার তালিকা

আইবিএস রোগীর খাবার তালিকা

ভুলভাল খাবার খেলে আইবিএস এর সমস্যা বাড়বে। খাবারের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। আইবিএস একেবারে ভালো হয় না। তবে খাবারদাবার ব্যালেন্স করে খেতে পারলে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন সম্ভব। জটিল ফাইবার ও ডেইরি প্রোডাক্ট একেবারেই বাদ দিতে হবে। এগুলো IBS রোগীর পেটে ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, বদ হজম ও ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।

আরো পড়ুন টাইফয়েড জ্বর হলে কি কি খাওয়া উচিত

আসুন জেনে নেয়া যাক কোন ধরনের খাবারগুলো খাবেন আর কোনগুলো খাবেন না।

FODMAP খাবার খাওয়া যাবে না

FODMAP এর পূর্ণরূপ হল ফার্মেন্টেবল অলিগোস্যাকারাইডস, ডিস্যাকারাইডস, মনোস্যাকারাইডস এবং পলিওলস। এগুলি হলো শর্ট চেইন কার্বোহাইড্রেট। আইবিএস রোগীদের এই ধরনের খাবার হজমে অসুবিধা হয়। যাদের এই খাবারগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতা রয়েছে তারা এগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এই ধরনের খাবারগুলো খেলে আপনার পেটে কোন সমস্যা হয় কিনা তা বোঝার জন্য ২-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত খাওয়া বন্ধ রাখুন। তারপর অল্প অল্প করে খেয়ে দেখুন কোন সমস্যা হয় কিনা।

সব ধরনের কার্বোহাইড্রেট কিন্তু আবার ফুডম্যাপ না। এখান থেকে কিছু ফুডম্যাপ খাবার সম্পর্কে জেনে নিন।

  • ল্যাকটোজ যেমন: দুধ, আইসক্রিম, পনির, দই
  • কিছু ফল যেমন: পীচ, তরমুজ, নাশপাতি, আম, আপেল, বরই
  • দানাদার বা বীজ জাতীয় খাবার যেমন: ছোলা, কিডনি বিন, মসুর
  • চিনি দিয়ে তৈরি সব ধরনের খাবার
  • গম বা গমের আটা দিয়ে বানানো সব ধরনের খাবার
  • উচ্চ খাদ্য আঁশ সম্বলিত কিছু শাকসবজি যেমন: ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পেঁয়াজ, বাঁধাকপি ইত্যাদি। সাধারণত পেটে গ্যাস তৈরি করে এমন শাকসবজি খাওয়া যাবেনা।

এই খাবারগুলো হলো উচ্চ ফুডম্যাপ সমৃদ্ধ খাবার ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম হলে এগুলো খাওয়া যাবে না। কম ফুডম্যাপ সমৃদ্ধ খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ল্যাকটোজ মুক্ত দুধ যেমন: বাদাম দুধ, সয়া দুধ ইত্যাদি
  • কমলা, ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি এবং আঙ্গুরের মতো কিছু ফল
  • ডিম
  • চর্বিহীন মাংস যেমন চামড়া ছাড়ানো দেশি মুরগি, টার্কি মুরগি ইত্যাদি
  • চর্বি মুক্ত সব ধরনের দেশীয় প্রজাতির মাছ
  • চাল বা কাউন চাল
  • গাজর, বেগুন, সবুজ মটরশুটি, কুমড়া ও জুচিনির মতো কিছু সবজি।

খাদ্য তালিকা খুব ছোট করলে আবার পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারেন। তাই একজন ডায়েটিশিয়ানের সাথে আলোচনা করে খাদ্য তালিকা করা দরকার।

উচ্চ খাদ্য আঁশ সম্বলিত খাবার

খাদ্য আঁশ বা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ ও প্রতিকার করে। তাই আইবিএস এর কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হলে তা করতে প্রয়োজন ফাইবার।একটা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের গড়ে প্রতিদিন ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার খেতে হবে।ফাইবার আবার দুই ধরনের হয়।

  • দ্রবণীয় ফাইবার: এই ফাইবার আইবিএস রোগীদের জন্য ভালো। কিছু ফল ও মটরশুঁটিতে এই ফাইবার রয়েছে।
  • অদ্রবণীয় ফাইবার: সবজি এবং শস্য গুলোতে এই ফাইবার পাওয়া যায়। আইবিএস থাকলে না খাওয়াই ভালো।

বেশিরভাগ খাবারে দুই ধরনের ফাইবার একসাথে থাকে। এই ধরনের খাবার গুলো সীমিত আকারে খেতে হবে। অদ্রবণীয় ফাইবারের ফার্মেন্টেশন রেট বেশি তাই এগুলো পেটে বেশি গ্যাস করে। দ্রবণীয় ফাইবারের ফার্মেন্টেশন রেট কম ফলে এগুলো খেলে পেটে কম গ্যাস হয়।

ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলোতে ফাইবার ছাড়াও অন্যান্য পুষ্ট উপাদান থাকে। তাই ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার একেবারে বাদ দেওয়া উচিত না। একজন আইবিএস রোগী প্রতিদিন কতটুকু পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ করবে সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে। প্রথমে অল্প অল্প করে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারগুলো খেতে হবে। আস্তে আস্তে মাত্রা বাড়াতে হবে এবং পেটে গ্যাস হলে মাত্রা কমিয়ে দিতে হবে।

গ্লুটেন মুক্ত খাবার খান

গ্লুটেন হচ্ছে এক ধরনের প্রোটিন। বিশেষ করে গম ও বার্লিতে গ্লুটেন পাওয়া যায়। গ্লুটেন যুক্ত খাবার খেলে অনেকের পেটে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ডাক্তাররা আইবিএস রোগীদের গ্লুটেন যুক্ত খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। কৃত্রিমভাবে তৈরি অনেক খাবারে থাকে যেমন: চিপস, চানাচুর, পাউরুটি, কিছু সস,
মল্ট ভিনেগার, বিয়ার ইত্যাদি।

গম, বার্লি ও রাই থেকে বানানো সব ধরনের খাবারে গ্লুটেন থাকে। গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার খেলে আপনার পেটে কোন সমস্যা হয় কিনা আগে সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যদি সমস্যা হয় সে ক্ষেত্রে গ্লুটেন যুক্ত খাবার খাবেন না।

চর্বিযুক্ত খাবার কম খেতে হবে

চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়ার অনেক স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে। নিয়মিত চর্বিযুক্ত খাবার খেলে মোটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এ কথাটা আমরা সবাই কম বেশি জানি। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার IBS কে প্রভাবিত করতে পারে যা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে IBS রোগীদের প্রতিদিন ২৭ গ্রাম এর চেয়ে কম চর্বি খাওয়া উচিত।

আইবিএস রোগীর জন্য উপযুক্ত খাবার

রোগীকে নিজেই নির্ধারণ করতে হবে সে কি খাবে আর কি খাবে না। কোন খাবার খেলে পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফুলে গেলে সেই খাবার খাওয়া যাবে না। কোন খাবার সহ্য করতে পারছেন আর কোনটা পারছেন না সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।

১.তরমুজ, নাশপাতি, আম, আপেল, বরই ইত্যাদি বেশি আঁশযুক্ত ফলের পরিবর্তে কমলা, স্ট্রবেরি, আঙ্গুর ইত্যাদি কম আঁশযুক্ত ফল খাওয়া যেতে পারে।

২. বেশি আঁশযুক্ত শাকসবজি যেমন: বাঁধাকপি, ফুলকপি, পেঁয়াজ, কাঁচা রসুন, মুলা, শসা ইত্যাদির পরিবর্তে কম আঁশযুক্ত শাকসবজি গাজর, বেগুন, কুমড়া ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

৩. দানাদার বা বীজ জাতীয় খাবার গুলো খাবেন না।
খাওয়া যাবে না বাদাম, কফি, অ্যালকোহল, গম ও দুধ দিয়ে তৈরি খাবার।

৪. খেতে পারবেন ডিম, কম চর্বিযুক্ত মাছ ও মাংস, ওটমিল।

৫. প্রচুর পরিমাণে পানি পান ও পর্যাপ্ত ঘুম দরকার।
মানসিক চাপ মুক্ত জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাভাবিক ব্যায়াম শুধু আইবিএস নয় সুস্থ থাকতে প্রয়োজন।

৬. জাঙ্ক ফুড একবারে নিষিদ্ধ, তেল ঝাল ও ভাজাপোড়া খাবার খেতে নিষেধ।

৭. চিনি যুক্ত খাবার, এনার্জি ড্রিংক, জর্দা, তামাক, চিপস, চানাচুর, ফুচকা, চটপটি প্যাকেটজাত খাবার একদম খাওয়া যাবেনা।

আইবিএস নিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর

কোন খাবার খেলে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম হয়?
রোগীকে নিজে নিজেই সেটা খুঁজে বের করতে হবে। কোন খাবার খেলে যদি আইবিএস এর উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে সেই খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। সাধারণত বেশি আঁশযুক্ত খাবার, গ্লুটেন যুক্ত খাবার, চর্বিযুক্ত খাবার, তামাক, জর্দা, অ্যালকোহল ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বাড়িয়ে দেয়।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম কি?
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম হলো আইবিএস এর পূর্ণ রূপ। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম ও আইবিএস একই রোগ।

আইবিএস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় কি?
নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। নিয়ম মেনে চলে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। উপযুক্ত খাদ্যাভাস তৈরি, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপমুক্ত জীবন যাপন আইবিএস রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *