রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত।

রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত বা রক্ত আমাশয় খাবার তালিকা রোগটি থেকে মুক্তি পেতে জানা প্রয়োজন। আমাশয় দুই ধরনের, সাধারণ আমাশয় ও রক্ত আমাশয়। পরিপাকতন্ত্রে শিগেলা নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের কারণে যে আমাশয় হয় তাকে ব্যাসিলারি আমাশায় বলে। এর অপর নাম শিগেলাসিস বলে। শিগেলাসিস হলে মলের সাথে রক্ত থাকে। আর এই কারণে আমাদের দেশে এই রোগটি রক্ত আমাশয় নামে পরিচিত। সঠিক চিকিৎসার অভাবে এই রোগটি ভয়াবহ হতে পারে।

শিগেলা ব্যাকটেরিয়া দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন: শিগেলা ব্যাকটেরিয়া দিয়ে দূষিত পানি ও খাবার খেলে শিগেলাসিস বা রক্ত আমাশয় হতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মলত্যাগের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত না ধুলে তার মাধ্যমে এই রোগ সুস্থ ব্যাক্তির দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত পানি জীবাণুমুক্ত হতে হবে। দূষিত পানিতে গোসল বা সাঁতার কাটার ফলে শিগেলাসিস হতে পারে।

রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ

রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত

রক্ত ও মিউকাস বা শ্লেষ্মাযুক্ত ডায়রিয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সাথে হাই ফিভার অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত জ্বর থাকবে। পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বল, অস্থির হয়ে যায়। শরীর থেকে লবণ পানি বের হয়ে যাওয়ার কারণে যদি পানি শূন্যতা দেখা দিতে পারে। পানি শূন্যতা দেখা দিলে আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ দেবে যাবে, জিহ্বা, মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাবে। মারাত্মক পানি শূন্যতায় কিডনিতে সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমনের ১ থেকে ৩ দিন পরে রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ গুলো প্রকাশ পায়। অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে আরো সময় লাগতে পারে। লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে একজন ডাক্তারের দেখানো উচিত। পানি শূন্যতা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশি বেশি তরল খাবার যেমন: ডাবের পানি, ভাতের মাড় ও খাবার স্যালাইন বেশি করে খাবেন।

রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত

রক্ত আমাশয় হতে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে কিছু খাবার। আক্রান্ত ব্যক্তিকে জানতে হবে কোন খাবারগুলো তার জন্য উপকারী আর কোন গুলো ক্ষতিকর। লক্ষণ গুলোর অবনতি ঘটায় এবং খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পেটে ব্যথা, গ্যাস, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে সঠিক খাবার বেছে নিতে হবে। যে খাবারগুলো সহজে হজম হয় সেগুলো খেতে হবে। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলো যথাসম্ভব কমিয়ে ফেলতে হবে। রক্ত আমাশয় রোগীর উপযুক্ত খাবারের মধ্যে রয়েছে।

ব্লান্ড ফুড

মসলাদার বা জটিল খাবার পেটে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি বাড়ায়। তাই এই ধরনের খাবার খেতে ডাক্তারদের নিষেধ রয়েছে। ব্লান্ড ফুড বা মৃসন খাবার গুলো সহজে হজম হয়। বদহজম, ডায়রিয়া বা আমাশয়ে ডাক্তাররা ব্র্যাট খেতে পরামর্শ দেয়।

কলা, সাদা চাল, আপেল সস ও রুটি বা টোস্ট এই চারটি খাবারকে একসাথে ব্র্যাট খাবার বলে। তাছাড়া সেদ্ধ আলু ও সাদা চালের ভাত শিগেলাসিস আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম দিনের উপযুক্ত খাবার। পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খেলে পেটের জন্য ভালো।

প্রোবায়োটিক

আমাশয় ও ডায়রিয়া হলে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের খারাপ ও ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। রক্ত আমাশয়ে শিগেলা ব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে পেটে সংক্রমণ ঘটায়। এমন অবস্থায় হজম শক্তি ঠিক রাখতে হবে। হজম শক্তি উন্নত করতে প্রোবায়োটিক বেশ কার্যকর।

প্রোবায়োটিক খাবার ভালো ও খারাপ ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ঠিক রাখে এবং বদহজম দূর করে। এই ধরনের খাবারের মধ্যে টক দই, কেফির ও পনির অন্যতম। কিন্তু ডেইরি প্রোডাক্ট যেমন: দুধ, দই, পনির ইত্যাদি চর্বিযুক্ত খাবার।

আরও পড়ুন বডি বিল্ডারদের খাবার তালিকা। ছেলেদের বডি বানানোর সহজ উপায়।

রক্ত আমাশয়ে চর্বিযুক্ত খাবার খেলে পেটের সমস্যা আরো বাড়বে। তবে সয়া দুধের টক দই খেতে পারেন। এই দই খেলে পেটের কোন সমস্যা হয় না। সবচেয়ে ভালো প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট। যাইহোক এই ব্যাপারে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।

তরল খাবার

রক্ত আমাশয়ে শরীর থেকে লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট এর ঘাটতি পূরণ করতে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। প্রতিবার মলত্যাগের পর অন্ততপক্ষে ১ কাপ পানি পান করতে হবে। সবচেয়ে ভালো ডাবের পানি ও খাবার স্যালাইন। রোগী যদি মুখে খেতে না পারে বা ডায়রিয়া ও বমি একসাথে চলতে থাকে তাহলে জরুরি ভিত্তিতে একজন ডাক্তার দেখাতে হবে।

রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত নয়

কিছু খাবার রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ ও উপসর্গ বৃদ্ধি করে।। এই খাবারগুলো খেলে পেটের সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। অর্থাৎ এই খাবার গুলো ঘন ঘন ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব ও পেটের অন্যান্য সমস্যাগুলো বৃদ্ধি করে। এই খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে-

ঝাল খাবার

এই অবস্থায় ঝাল খাবার সম্পূর্ণ পরিহার করা উচিত। ঝাল খাবারে ক্যাপসাইসিন নামের এক ধরনের উপাদান থাকে। ক্যাপসাইসিন পেটে অস্বস্তি বাড়ায়। আর পেটে অস্বস্তি বাড়লে পেটের সমস্যাগুলো গুরুতর হওয়াই স্বাভাবিক। আমাশয় ও ডায়রিয়াতে পরিপাকতন্ত্রকে যত কম উত্তেজিত করা যায় ততই ভালো।

ভাজা খাবার

ভাজাপোড়া খাবার ডায়রিয়া ও আমাশয়ে খেতে নিষেধ এ কথা আমরা সবাই জানি। রক্ত আমাশয় থেকে সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে ভাজা খাবার খাওয়া ঠিক নয়। এই অবস্থায় কোন তেল চর্বি যুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। খাবার ভেজে খেলে এর তেল চর্বি পাকস্থলীকে উত্তেজিত করবে। এমনিতেই তেল চর্বি হজম করা একটু কঠিন।

সবসময় ভাজা খাবারের পরিবর্তে সেদ্ধ বা স্টিম করা শাকসবজি বা লেন প্রোটিন খাওয়া ভালো। আর রক্ত আমাশয়ে তো বটেই।

চিনি দিয়ে বানানো খাবার

সব ধরনের চিনিযুক্ত খাবার এই অবস্থায় খেতে নিষেধ। ক্যান্ডি, মিষ্টি, মিষ্টি কেক-বিস্কিট সহ সব ধরনের চিনি দিয়ে বানানোর খাবার এই অবস্থায় এড়িয়ে যাবেন। আর আর্টিফিশিয়াল সুইটনার এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার

আঁশযুক্ত বা ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। হজম ক্রিয়া ভালো রাখার জন্য ফাইবার প্রয়োজন। রক্ত আমাশয়ে পরিপাকতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। পরিপাকতন্ত্র পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারগুলো না খাওয়াই ভালো।
উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • গম বাদামি চাল ও বার্লির মতো গোটা শস্য এবং গোটা শস্য থেকে বানানো সব ধরনের খাবার।
  • বাদাম ও অন্যান্য বীজ জাতীয় খাবার।
  • প্যাকেটজাত ও প্রসেস ফুড।
  • ছোলা, মটরশুঁটি, মটর ও মসুর ডাল অর্থাৎ লেগুম জাতীয় খাবার।
  • যেসব খাবার পেটে গ্যাস বাড়ায়। যেমন: বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি, রেড মিট, ডেইরি প্রোডাক্ট ও সালাদ।
  • চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক ইত্যাদি।

তবে আপেল ও কলাতে পেকটিন নামের ফাইবার থাকে যা রক্ত আমাশয় রোগীর জন্য উপকারী।

শেষ কথা: আশা করি রক্ত আমাশয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। এই সংক্রামক রোগটি প্রতিরোধে আমাদের সচেতন হতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *