জন্ডিস রোগ হলে কোন কোন খাবার খেতে হবে?

জন্ডিস হতে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে কতিপয় বিশেষ খাবার। আবার কিছু খাবার খেলে জন্ডিস বৃদ্ধি পায়। তাই জন্ডিস রোগীদের জানা দরকার কোন খাবারগুলো উপকারী আর কোনগুলো ক্ষতিকর। লিভারের সুস্থতার সাথে জন্ডিসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

লিভারের কার্যকারিতায় সমস্যা হলে রক্তে বিলিরুবিন এর পরিমাণ বেড়ে যায়। আর বিলিরুবিন এর পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়লে ত্বক, চোখ ও প্রস্রাব হলুদ হয় যাকে জন্ডিস বলে। লিভারকে সুস্থ রাখতে সুষম খাদ্য খেতে হবে। নিয়মিত সুষম খাদ্য খেলে জন্ডিসের লক্ষণগুলো হ্রাস পায়।

নবজাতক, ছোট শিশু, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কিশোর এবং বৃদ্ধ বয়সে জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ২ থেকে ৩ মিলিগ্রাম বা তার বেশি হলে জন্ডিসের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে।

জন্ডিস কি?

জন্ডিস রোগীর খাবার তালিকা।

লিভার শরীর থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত রক্ত কণিকা ও বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। আমাদের লোহিত রক্ত কণিকা একটা নির্দিষ্ট সময় পর স্বাভাবিকভাবেই ধ্বংস হয়ে বিলিরুবিনে পরিবর্তিত হয়। এই বিলিরুবিন লিভারে এসে পিত্তরসে পরিণত হয় যা পিত্তথলি হয়ে পিত্ত নালীর মাধ্যমে পাকস্থলীতে আসে। পরবর্তীতে মলত্যাগের মাধ্যমে বিলিরুবিন শরীর থেকে বের হয়।

এইটা হলো সুস্থ শরীরের একটি স্বাভাবিক কার্যকলাপ। কোন কারণে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হলে এবং অতিরিক্ত মাত্রায় বিলিরুবিন তৈরি হলে সেটা লিভার থেকে সরাসরি রক্ত ​​​​প্রবাহে মিশে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে জন্ডিস দেখা দেয়। তাহলে এই বিষয়টা স্পষ্ট যে জন্ডিস নিজে কোন রোগ নয় বরং অন্য রোগের লক্ষণ রূপে প্রকাশ পায়।

জন্ডিস এর কারণ

শরীরে বিলিরুবিন ঠিকমতো প্রক্রিয়াকরণ না হলে জন্ডিস হয়। শরীরে বিলিরুবিন এর পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তাকে হাইপার বিলিরুবিনেমিয়া বলে। তখন চোখ, শরীরের বিভিন্ন অংশের চামড়া ও প্রস্রাব হলুদ রঙের হয় বা জন্ডিস হয়। অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদনের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এগুলো হল-

  • পিত্তথলির রোগ
  • অত্যধিক অ্যালকোহল গ্রহণ
  • গলব্লাডার বা অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার
  • লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার
  • হেপাটাইটিস বা অন্যান্য লিভার সংক্রমণ (যেমন: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ইত্যাদি)
  • হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া
  • নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

তাছাড়া নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিউনেটাল জন্ডিস কোন চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। কখনো কখনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তাই নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে একজন ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন।

জন্ডিস রোগীর খাবার তালিকা

জন্ডিস থেকে সুস্থ হতে ও জন্ডিস প্রতিরোধে খাবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লিভার পিত্তরস তৈরি করে যা চর্বি জাতীয় খাবার হজমে প্রয়োজন হয়। শরীরে তৈরি হওয়া দূষিত পদার্থ অপসারণ, হজমের পর খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ ও ওষুধ প্রক্রিয়াকরণ লিভারের কাজগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

সব ধরনের খাবার সহজে হজম হয় না। বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাট হজম করা একটু কঠিন। কোন খাবার হজম করা সহজ না হলে সেক্ষেত্রে লিভারকে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই লিভারের ওপর চাপ কমাতে আমাদের সব সময় লিভার বান্ধব খাবার খাওয়া উচিত। লিভার সুস্থ থাকলে জন্ডিস নিরাময় ও প্রতিরোধ সহজ হয়।

বিশেষ করে কিছু ঔষধ ও অ্যালকোহল বিপাকের সময় লিভারের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিভার সুস্থ রাখতে হলে অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে বাদ দিন এবং ঔষধ সেবনের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

আসুন জন্ডিস রোগীর খাবার তালিকা বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

লিভার সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পানি খাবার হজমকে সহজ করে লিভারের উপর চাপ কমায়। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করতে লিভার ও কিডনির জন্য সহজ হয়। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন কমপক্ষে ২.৫ লিটার পানি পান করা উচিত।

ডাবের পানি ও আখের রস পানি শূন্যতা রোধ করার পাশাপাশি লিভারের যত্ন নেয়।

তাজা ফলমূল এবং সবজি

তাজা ফল ও শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। সহজে হজম হয় তাই লিভারের উপর চাপ সৃষ্টি হয় না। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিপাকের সময় লিভারের কোষকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচায়।

আসলে সব ধরনের ফল , মূল ও শাকসবজিতে লিভার বান্ধব পুষ্টি থাকে। তবে বিশেষ কিছু ফলমূল ও শাকসবজি লিভারের জন্য খুবই উপকারী এবং দ্রুত জন্ডিস নিরাময়ে সাহায্য করে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • তাজা ফল: ব্লুবেরি, আঙ্গুর, সাইট্রাস ফল (যেমন: লেবু, কমলা, জাম্বুরা ইত্যাদি), পেঁপে, তরমুজ, অ্যাভোকাডো, জলপাই, টমেটো, কলা।
  • শাকসবজি: ব্রকলি, ফুলকপি, কুমড়া, পালং শাক এর সবজি গুলো।
  • মূল জাতীয় সবজি: মিষ্টি আলু, গাজর, বীট এবং শালগম।
  • আদা ও রসুন জন্ডিস রোগীর জন্য উপকারী।

জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের উচ্চ আঁশযুক্ত এবং কম ক্যালোরির খাবার খেতে হবে। এক্ষেত্রে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি একটি আদর্শ খাবার।

গোটা শস্য

লিভার বান্ধব পুষ্টি উপাদানে ভরপুর আরো একটি খাবার হল আস্ত শস্যদানা বা গোটা শস্য। এগুলো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজ লবণ দিয়ে ভরপুর। গোটা শস্য বলতে বোঝায় একটা শস্য দানার সবটুকু অংশ। ওটস, বাদামি চাল, লাল চাল, কালো চাল, গম, কুইনোয়া, ভূট্টা, শস্য দানা ইত্যাদি হলো গোটা শস্য। কিন্তু বাদামি চালকে প্রক্রিয়াকরণ করার মাধ্যমে সাদা চালে পরিবর্তন করা হলে সেটা আর গোটা শস্যে থাকে না।

আরও পড়ুন স্থায়ী মোটা হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ টিপস।

আমাদের প্রধান খাবার হলো ভাত যা গোটা শস্যের অন্তর্ভূক্ত। আমরা সাধারণত গোটা শস্যের মধ্যে বাদামি চালের ভাত ও গমের রুটি সবচেয়ে বেশি খাই। এই দুটি খাবার লিভার বান্ধব খাবার।

আমিষ জাতীয় খাবার

মাছ, মাংস, মসুর ডাল ও শিমের বীচিতে প্রচুর আমিষ থাকে। আসলে সব ধরনের উদ্ভিদ বীজ জাতীয় খাবারে আমিষ ও বহু পুষ্টি উপাদান থাকে। বাদাম, মটরশুটি ও শিমের বীচি আমিষ ছাড়াও ভিটামিন ই, ফেনোলিক এসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার ও হেলদি ফ্যাট ধারণ করে। লিভারের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং জন্ডিস নিরাময়ে এই খাবারগুলো নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন।

আমিষের জন্য মাছ ও চর্বিহীন মাংস খেতে পারবেন। মুরগির মাংস, টার্কি মুরগির মাংস, কবুতরের মাংস জন্ডিস রোগীর খাদ্য তালিকায় রাখা দরকার।

জন্ডিস ছাড়াও হেপাটাইটিস, পিত্তথলিতে পাথর বা টিউমার, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ থাকলে এই খাবারগুলো উপকারী। তাছাড়া যারা নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ বা ব্যথানাশক ওষুধ, স্টেরয়েড, ইমিউন এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খাচ্ছেন তাদের লিভারের সুরক্ষায় লিভার-বান্ধব খাবার খাওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

জন্ডিস রোগীর নিষিদ্ধ খাবার

অ্যালকোহল, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, অনেক প্যাকেটজাত ও টিনজাত খাবার, অর্ধ সিদ্ধ মাছ মাংস, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট, রেড মিট বিশেষ করে গরুর মাংস লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং জন্ডিস নিরাময়ে বাধা দেয়। পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট ডায়াবেটিস, হৃদরোগ শরীরের ওজন বাড়ায়।

স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট

স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট এর ব্যাপারে একটু জানা দরকার। ভাজাপোড়া খাবার ও ফাস্টফুড খাবেন না। এগুলোতে অতিরিক্ত পরিমাণে স্যাচুরেটেড এবং ট্রান্স ফ্যাট থাকে ফলে হজমে সমস্যা হয় এবং লিভারের ক্ষতি করে। ইনসুলিন নামের এক ধরনের হরমোন রক্তে গ্লুকোজ বা চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

ইনসুলিন রেসিসন্ট্যান্ট বাড়লে রক্তে গ্লুকোজ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়বে। যারা সিঙ্গারা, পুরি, বার্গার, সব ধরনের ফাস্টফুড, এনার্জি ড্রিংকস লিভারের ক্ষতির পাশাপাশি হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।

দুধ, দই, পনির ও দুধ দিয়ে তৈরি সব ধরনের খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। তাই এই ধরনের খাবার গুলো না খাওয়াই ভালো।

লিভার জন্ডিস কেন হয়?

লিভার জন্ডিস লিভারে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ জনিত কারণে হয়। ডাক্তারি ভাষায় এই রোগের নাম হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে হতে পারে।

লিভারে ভাইরাস সংক্রমনের কারণে হেপাটাইটিস হলে তাকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলে। সাধারণত হেপাটাইটিস এ,বি,সি,ডি ও ই (Hepatitis A,B,C,D,E) এই পাঁচটি ভাইরাস ভাইরাল হেপাটাইটিস ঘটায়। সব ধরনের ভাইরাল হেপাটাইটিসের লক্ষণ গুলো প্রায় একই ধরনের।

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণেও হেপাটাইটিস হয় বিশেষ করে সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া যা টাইফয়েড জ্বরের কারণ। অর্থাৎ টাইফয়েড জ্বরের এই ব্যাকটেরিয়া লিভার জন্ডিস বা লিভারে সংক্রমণ ঘটায়। কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেও লিভার জন্ডিস হতে পারে। যেমন: যক্ষ্মা রোগের ওষুধ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন, কেমোথেরাপির ওষুধ ইত্যাদি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে লিভার জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

লিভার জন্ডিসের লক্ষণ

লক্ষণ গুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • জন্ডিস দেখা দেয়
  • পেটের উপরিভাগে ডান পাশে ব্যথা হয়
  • শরীরে জ্বর আসে
  • কোন কিছু খেতে মন চায় না খাওয়ার অরুচি হয়
  • বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে বমি এতই তীব্র হয় সে কিছু খেতে পারে না।
  • দুর্বলতা ও ক্লান্তি বোধ হেপাটাইটিস বা লিভার জন্ডিসের সাধারণ উপসর্গ।

এগুলো লিভার জন্ডিসের লক্ষণ। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে একজন ডাক্তার দেখাতে হবে।

জন্ডিসের সাথে সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নোত্তর (FAQs)

জন্ডিস হলে কি ডিম খাওয়া যাবে?
খেতে পারেন তবে খুব অল্প পরিমাণে। জন্ডিস হলে পেটে সমস্যা দেখা। তাই সহজে হজম হয় এমন খাবার খেতে হবে। ফ্যাট জাতীয় খাবারগুলো হজমের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ডিমে অনেক ফ্যাট থাকে তাই জন্ডিস দেখা দিলে বেশি বেশি ডিম খাওয়া ঠিক হবে না।

জন্ডিস কমানোর উপায় কি?
ডাক্তার দেখান এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন, আখের রস, ডাবের পানি, হার্বাল চা, চিনি ছাড়া লেবুর শরবত, কমলা, তরমুজের জুস খান। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ সেবন বন্ধ রাখুন কেননা কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিকার কারণেও জন্ডিস হয়।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *