হাঁসের ডিমের উপকারিতা ও অপকারিতা। হাঁসের ডিম খাওয়ার নিয়ম।

হাঁসের ডিম না মুরগির ডিম, কোন ডিম খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায় বিষয়টা অনেকেই জানতে চায়। ডিম পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে অন্যতম। ডিমে দুটো অংশ থাকে। কুসুম ও কুসুমের চারদিকে সাদা অংশ। হাঁসের ডিমের রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। আমাদের প্রতিদিনের আমিষের চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে হাঁসের ডিম খেলে।

অনেকেই মনে করে হাঁসের ডিম খেলে কোলেস্টেরল ও ওজন বাড়ে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। আসলে হাঁসের ডিমে ভালো কোলেস্টেরল থাকে ‌যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। আসুন হাঁসের ডিমের উপকারিতা, অপকারিতা ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানা যাক।

হাঁসের ডিমের পুষ্টিগুণ

হাঁসের ডিমের উপকারিতা ও অপকারিতা।

আসলে সব ডিমেই প্রচুর পরিমাণে আমিষ থাকে। হাঁসের ডিমের সাইজ মুরগির ডিম থেকে বড় হওয়ায় এর আমিষ ও অন্যান্য পুষ্টির পরিমাণ কিছুটা বেশি। ডিমের কুসুমে চর্বি, ভালো কোলেস্টেরল, ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে।

১ টি হাঁসের ডিমে রয়েছে:

  • ক্যালরি: ১৮৫
  • ফ্যাট: ১৪ গ্রাম
  • প্রোটিন বা আমিষ: ১৩ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট: ১ গ্রাম
  • আয়রন: আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ২১ ভাগ
  • ভিটামিন-ডি: আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ১৭ ভাগ
  • রিবোফ্লেভিন: আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ২৪ শতাংশ
  • সেলেনিয়াম: আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ৫২ শতাংশ
  • ভিটামিন বি১২: আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ৯০ শতাংশ

রেড ব্লাড সেল বা লোহিত রক্ত কণিকা গঠন, ডিএনএ সংশ্লেষণ ও হেলদি নার্ভ ফাংশন এর জন্য ভিটামিন বি ১২ দরকার হয়। এক কথায় ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন হতে পারেনা ও নার্ভ সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায়। তাই এই ভিটামিনের লেভেল ঠিক রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের শরীরের জন্য প্রতিদিন যতটুকু ভিটামিন বি ১২ প্রয়োজন তার ৯০ শতাংশ পূরণ হয় একটি হাঁসের ডিম খেলে। তাই ভিটামিন বি ১২ এর দৈনিক চাহিদা মেটাতে ১টি হাঁসের ডিম যথেষ্ট।

হাঁসের ডিমের উপকারিতা

ডিমের পুষ্টিগুণের জন্য একে আদর্শ খাবার বলা হয়। তাছাড়া এতে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য উপকারী কম্পাউন্ড থাকে। হাঁসের ডিমের কুসুমে ক্যারোটিনয়েড নামের এক ধরনের ন্যাচারাল পিগমেন্ট থাকে। আর এই পিগমেন্ট এর কুসুমের রং হলুদ কমলা দেখায়। ক্যারোটিনয়েড মূলত এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষ ও ডিএনএ কে অক্সিডেটিভ ড্যামেজ থেকে রক্ষা করে।

হাঁসের ডিমের কুসুমে থাকা প্রধান কম্পাউন্ড গুলো হলো ক্যারোটিন, ক্রিপ্টোক্সানথিন, জিক্সানথিন এবং লুটেইন। এদেরকে একত্রে ক্যারোটিনয়েড বলা হয়। এই ক্যারোটিনয়েড গুলো ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, চোখে ছানি পড়া, হৃদরোগ এবং কয়েক ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

আরও পড়ুন ইউরিন ইনফেকশন হলে কি করা উচিত।

তাছাড়া অন্যান্য ডিমের কুসুমের মতোই হাঁসের ডিমের কুসুমে কোলিন থাকে। কোলিন হলো এক ধরনের ভিটামিন যা কোষপ্রাচীর, মস্তিষ্ক, নিউরোট্রান্সমিটার এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা ভালো রাখার জন্য প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়ের পেটের বাচ্চার সুস্থ ব্রেইন এর জন্য কোলিন প্রয়োজন। একইভাবে বয়স্ক ব্যক্তিদের ব্রেইন সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ভিটামিন যা ডিমের কুসুমে পাওয়া যায়।

হাঁসের ডিমসহ অন্যান্য ডিমের সাদা অংশে প্রচুর পরিমাণে আমিষ বা প্রোটিন থাকে এ কথা আমরা সবাই কম বেশি জানি। কিন্তু ডিমের সাদা অংশে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে যা আমাদের অনেকেরই অজানা। এই উপাদানগুলো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের সুরক্ষা দেয়।

উপরে ডিমের পুষ্টি উপাদানের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই পুষ্টি উপাদান গুলোর অভাবে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা। যেমন: জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম এবং সেলেনিয়ামের ঘাটতি ডিপ্রেশন হতে পারে। এই তিনটি মিনারেল ডিমে থাকে। অন্যান্য ডিমের তুলনায় হাঁসের ডিমে সেলেনিয়াম বেশি থাকে। ১টি হাঁসের ডিমে দৈনিক যতটুকু সেলেনিয়াম প্রয়োজন তার অর্ধেক থাকে। তাই ডিপ্রেশন প্রতিরোধে প্রতিদিন অন্তত ১টি হাঁসের ডিম খেতে পারেন।

সাম্প্রতিককালে গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন বি ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্সে যে ৮টি ভিটামিন থাকে তার প্রত্যেকটি হেলদি স্কিনের জন্য প্রয়োজন। হাঁসের ডিমে এই ভিটামিন গুলো পাওয়া যায়।

ভিটামিন বি ১: ভিটামিন বি ১ হলো অ্যান্টি স্ট্রেস ভিটামিন। এই ভিটামিন মানসিক চাপ প্রতিরোধে ও কমাতে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি ২: কোলাজেন বজায় রাখে এবং ইনফ্লামেশন কমায় ফলে ত্বক সতেজ ও প্রাণবন্ত থাকে।
ভিটামিন বি ৩: ব্রণ, একজিমা এবং ডার্মাটাইটিস প্রতিরোধে কাজ করে।
ভিটামিন বি ৫: ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে।
ভিটামিন বি ৬: ত্বক শুষ্ক হতে বাধা দেয়, ইনফ্লামেশন কমায় ও ফ্রেশ ঘুম নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
ভিটামিন বি ৭: ত্বককে ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে।
ভিটামিন বি ৯: কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি ১২: ত্বকে ব্রণ হতে বাধা প্রদান করে, শুষ্কতা প্রতিরোধ করে এবং প্রদাহ কমায়।

হাঁসের ডিমের অপকারিতা

হাঁসের ডিমের কিছু অপকারিতাও রয়েছে। উপকারিতার পাশাপাশি অপকারিতা সম্পর্কেও জানা দরকার। অপকারিতা গুলোর মধ্যে রয়েছে:

হাঁসের ডিমে এলার্জি

হাঁসের ডিম খেলে কারো কারো এলার্জি দেখা দেয়। এলার্জি থেকে স্কিন র্যাশ, বদহজম, বমি এমনকি এলার্জি জনিত ডায়রিয়া হতে পারে। তবে এই সমস্যাগুলো সবার ক্ষেত্রে হয় না। শিশুদের ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে। যদি আপনার শিশুকে হাঁসের ডিম খাওয়ালে এলার্জি জনিত সমস্যা দেখা দেয় পরবর্তীতে কখনো খাওয়াবেন না।

হৃদরোগের ঝুঁকি

হাঁসের ডিমে প্রচুর কোলেস্টেরল থাকে যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সুস্থ ব্যক্তির উপর ডিমের এই কোলেস্টেরলের কোন খারাপ প্রভাব নেই।‌ যদি কারো ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকে তাহলে হাঁসের ডিম না খাওয়াই ভালো। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে ডিমের কোলিন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

আমাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো কোলিন থেকে ট্রাইমেথাইলামাইন এন-অক্সাইড নামক এক ধরনের কম্পাউন্ড তৈরি করে। এই কম্পাউন্ডটি হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। কারো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হাঁসের ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

হাঁসের ডিম খাওয়ার নিয়ম

অন্যান্য ডিমের মতো হাঁসের ডিম সিদ্ধ করে, ভেজে, তরকারি রান্নায় নানাভাবে খাওয়া যায়। হোটেলে সকালের নাস্তায় ডিম ওমলেট রুটির সাথে বেশ প্রচলিত। বাসা বাড়িতেও সকালের নাস্তায় ডিম ওমলেট অনেকের পছন্দ। ভাজা ডিমের চেয়ে সেদ্ধ ডিমে ক্যালরি কম পাবেন। তেলে ভেজে খেলে ক্যালরি বাড়বে। সেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়িয়ে আলু, পেঁয়াজ, টমেটো বা বেগুনের সাথে রান্না করলে খেতে খুব সুস্বাদু। যাইহোক, ডিম দিয়ে তরকারি রান্না করার পদ্ধতি বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের।

হাঁসের ডিম সম্পর্কে কিছু প্রশ্নোত্তর

হাঁসের ডিম খেলে কি হয়?
হাঁসের ডিম একটি পুষ্টিকর খাবার। এর নানা উপকারিতা রয়েছে। হাঁসের ডিম খেলে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তবে এর কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। এলার্জি ও কোলেস্টেরল বাড়তে পারে হাঁসের ডিম খেলে। কিন্তু পরিমিত মাত্রায় খেলে কোন সমস্যা হয় না।

হাঁসের ডিমে কি এলার্জি আছে?
হাঁসের ডিমে এলার্জি আছে তাই অনেকের এলার্জি দেখা দেয়। সবার ক্ষেত্রে এলার্জি দেখা দেয় না। আসলে ফুড এলার্জি সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করতে পারে না। তাই হাঁসের ডিম খেলে সবার এলার্জি হয় না।

হাঁসের ডিমের দাম কত?
দাম বাড়ে কমে, সব সময় এক থাকে না। বর্তমানে একটি ডিমের দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা।

হাঁসের ডিম খেলে কি প্রেসার বাড়ে?
ডিমের সাথে প্রেসারের কোন সম্পর্ক নেই। ডিমের কুসুমে হেলদি ফ্যাট থাকে যার শরীরে ফ্যাট বার্ন করতে হেল্প করে। তবে ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকে। কোলেস্টেরল দুই প্রকারের, একটি হল এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল অপরটি এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল। হাঁসের ডিম খেলে ভালো ও খারাপ উভয় কোলেস্টেরল বাড়ে তাই এ ব্যাপারে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

১ টি হাঁসের ডিমে কত ক্যালরি?
১টি হাঁসের ডিমে ১৮৫ ক্যালরি থাকে। এইটা এভারেজ ধরা হয়েছে। ডিমের সাইজ বড় হলে ক্যালরি বাড়বে এবং ছোট হলে ক্যালরি কমবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *