জেনে নিন সিজারের পর খেতে হবে কোন কোন খাবার।

সিজার পরবর্তী সময়ে কিছু কিছু খাবার দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। আবার কিছু খাবার এই সময়ে খাওয়া উচিত নয়। দ্রুত সুস্থ হওয়া নির্ভর করে খাবার, বিশ্রাম, যত্ন, সুচিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ের উপরে। সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে সিজারের পর।

তবে এখানেও অনেক বাধা বিপত্তি পার হতে হয়। বিশেষ করে নবজাতক সন্তানের খেয়াল রাখতে গিয়ে মায়েদের নিজের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা হয়ে ওঠে না। সিজারের পর মায়েদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিতকরণে সাহায্য করতে পারে আমাদের এই পোস্ট। এখানে বিশেষ কতগুলো খাবার সম্পর্কে জানানো হয়েছে যা সিজারের পর দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে।

সিজারের পর পুষ্টিকর খাবার কেন খাবেন

সিজারের পর পুষ্টিকর খাবারের যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অস্ত্রোপচারের কারনে স্বাভাবিক ভাবেই শরীর ক্লান্ত ও দুর্বল লাগবে। সিজারের ফলে হারানো শক্তি ফিরে পেতে পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই।

সিজারের পর খাবার তালিকা

৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধের উপর নির্ভর করে। তাই এই সময়ে মাকে বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। গর্ভাবস্থায় বেড়ে যাওয়া ওজন কমাতে সিজার পরবর্তীতে সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। তাছাড়া কাটা স্থান দ্রুত নিরাময়ে সাহায্য করবে পুষ্টিকর খাবার। এই সময়টাতে মায়েদের শর্করা, আমিষ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষভাবে সাহায্য করে।

সিজারের পর খাবার তালিকা

সিজারের পরবর্তী সময়ে একজন মহিলার পরিপাকতন্ত্রের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে। খাবারের প্রতি অনিহা আসা স্বাভাবিক ব্যাপার। এজন্য পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খাবার খেতে হবে। পানি ও তরল খাবার খেতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে।

১.ভিটামিন যুক্ত খাবার

ভিটামিন যুক্ত খাবার এ সময়কার খাদ্য তালিকায় রাখতেই হবে। ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। তাজা ফলমূল ও শাকসবজিতে ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অনেক প্রয়োজনীয় মিনারেল থাকে। কমলা, পেঁপে, তরমুজ, স্ট্রবেরি, জাম্বুরা, লেবু, আমড়া, আম, পেয়ারা ইত্যাদি ফল সিজার পরবর্তী সময়ে ভিটামিনের যোগান দিতে পারে।

ভিটামিন যুক্ত শাকসবজির মধ্যে রয়েছে পটল, ঝিঙ্গা, লাল শাক, কচু শাক, পালং শাক, ডাটা, কাঁচা কলা, করলা, মিষ্টি আলু, গাজর, মুলা,ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ইত্যাদি।

২.প্রোটিন, মিনারেল ও ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার

সিজার পরবর্তী সময়ে মায়েদের প্রোটিন যুক্ত খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। নতুন কোষ তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন। প্রোটিনযুক্ত খাবারগুলো খেলে ড্যামেজ টিস্যু দ্রুত ঠিক হয়।

অপরদিকে ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতকে শক্তিশালী করে, পেশী শিথিল করে, সঠিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন রকমের হাড়ের রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বুকের দুধের মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে নবজাতকের শরীরে যায়। ফলে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই ঘাটতি প্রতিরোধ করতে মায়েদের ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার গুলো গুরুত্ব সহকারে খেতে হবে।

আরো পড়ুন ইসিজি রিপোর্ট বোঝার নিয়ম বা উপায়।

মাছ, মুরগির মাংস, ডিম, বীজ ও ডাল জাতীয় খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে। যেমন: তিলের বীজে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, কপার, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। আর ক্যালসিয়ামের জন্য দুগ্ধজাত পণ্য খেতে হবে। কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধ জাত পন্য যেমন: স্কিমড মিল্ক, কম চর্বিযুক্ত দই, পনির ইত্যাদি খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম থাকে

৩.গোটা শস্য দানা জাতীয় খাবার

গোটা শস্য দানা জাতীয় খাবার সিজারিয়ান মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন। গোটা শস্য দানা হল কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার শরীরের শক্তি বাড়াবে। তাছাড়া কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার গুলোর বুকের দুধ তৈরিতে ভূমিকা থাকে।

গোটা শস্য দানাদার খাবার কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি আয়রন, ফাইবার এবং ফলিক অ্যাসিড সরবরাহ করে। এই পুষ্টি উপাদান গুলো শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে দরকার। একজন মা যদি কোন গোটা শস্য খাবার খায় তাহলে এর পুষ্টি উপাদান বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু পাবে। ওটস, বার্লি, লাল আটা, বাদামি চাল, কাউন চাল ইত্যাদি আমাদের দেশে পরিচিত গোটা শস্য দানা খাবার।

৪.ফাইবার বা আঁশ যুক্ত খাবার

সিজারের কারণে হজম ক্রিয়া কিছুটা কমে যায়। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। আর কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে চাপ পড়ার ঝুঁকি থাকে সেলাইয়ের জায়গায়। ফাইবার যুক্ত খাবার গুলো খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না। ফলে ক্ষতস্থানে চাপ পড়ার ঝুঁকি কমে।

ফাইবার যুক্ত খাবার গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মসুর ডাল, ছোলা, অন্যান্য ডাল জাতীয় খাবার, মিষ্টি আলু, আপেল, কমলা, সাইট্রাস ফল, পালং শাক, মটরশুটি ইত্যাদি।

৫.আয়রন যুক্ত খাবার

সিজারের কারণে রক্তপাত হওয়া স্বাভাবিক, এই কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। আয়রন যুক্ত খাবার খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হবে। ১৯ বছরের ওপরে মহিলাদের প্রতিদিন ৯ মিলিগ্রাম আয়রনের প্রয়োজন। ডিমের কুসুম, গরুর কলিজা, সবুজ শাকসবজি, দুধের ছানা, চিকেন, সয়াবিন, ছোলায় আয়রন থাকে।

৬.পানি ও তরল খাবার

সিজারের পরবর্তী সময়ে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে যেন পানিশূন্যতা না হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য ও পানিশূন্যতা দুটোই দূর হবে যদি পানি ও অন্যান্য তরল খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলে।

যেমন: ডাবের পানি, দুধ, ফলের রস, হার্বাল টি, বাটারমিল্ক, স্যুপ ইত্যাদি তরল খাবার মায়ের অনেক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করবে। ক্যালসিয়াম ফর্টিফাইড ড্রিঙ্ক, দুধ, দই, তাজা ফলের রসের মতো যে তরল খাবারগুলো রয়েছে সেগুলো খেলে মায়ের বুকের দুধ বাড়ে।

৭.শাকসবজি ও ফলমূল

আসলে শাকসবজি ও ফলমূল প্রত্যেকের খাদ্য তালিকায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সিজারের পর প্রতিটি মায়ের উচিত শাকসবজি ও ফলফলাদি আগের চেয়ে বেশি খাওয়া। বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি কোন ভাবেই মিস করা উচিত হবে না। কেননা সবুজ শাকসবজি ভিটামিন, আয়রন এবং ক্যালসিয়ামে ভরপুর।

মটরশুটি, পালং শাক, ব্রোকলি, লাউ, লাউ শাক, মিষ্টি কুমড়ো শাক, ধনে পাতা, শিম, বরবটি, শসা, করলা ইত্যাদি সবুজ শাকসবজিতে সিজারিয়ান মায়ের অনেক পুষ্টি চাহিদা মিটবে। ভিটামিন সি যুক্ত ফল মা ও নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে।

সিজারের পর কি কি খাওয়া যাবে না

বিশেষ করে প্রসেস ফুড এবং ফাস্টফুড সব সময় এড়িয়ে চলতে হবে। গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে এমন মায়ের জন্য এই খাবারগুলো একদম নিষেধ। ফাস্টফুড, চকলেট, আইসক্রিম ও অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবার গুলোতে পুষ্টি থাকে না।

জাঙ্ক ফুড খেতে মজা লাগে কিন্তু শরীরের জন্য কোন উপকারে আসে না, উল্টো আরো ক্ষতি করে। এই খাবারগুলোতে অতিরিক্ত তেল, চর্বি, চিনি, কৃত্রিম রং এবং সুস্বাদু করার জন্য রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা শুধু মায়েদের জন্য নয় শিশুর স্বাস্থ্যের উপরের খারাপ প্রভাব ফেলে।

ক্যাফেইন যুক্ত ড্রিংকস বাদ দিতে হবে। বিশেষ করে চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংক। ফুলকপি, কেইল, বাঁধা কপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট, ব্রকলি ইত্যাদি ক্রুসিফেরাস সবজি খাওয়া ভালো। তবে এই সবজিগুলো পেটে গ্যাস বাড়ায় তাই সিজারের পর এগুলো কম করে খাবেন। ভাজাপোড়া খাবার থেকে দূরে থাকাও জরুরি।

কিছু প্রশ্নোত্তর

সিজারের পর কি আনারস খাওয়া যাবে?
সিজারের পর আনারস খেতে কোন নিষেধ নেই। অন্যান্য ফলের মত আনারসে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। আনারস খেলে যদি আপনার এলার্জি বাড়ে তাহলে আনারস খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তাছাড়া সিজারের পর আনারস খেলে কোন সমস্যা হয় না।

সিজারের পর গরুর মাংস খাওয়া যাবে?
সিজারের পর গরুর মাংস খাওয়া যায়। যদি এলার্জি থাকে, কোলেস্টেরল, হাই প্রেসার থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। স্বাভাবিক ভাবে খাওয়া যায়। গরুর মাংসে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন থাকে যা মায়েদের প্রয়োজন। অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে ক্যালরি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই পরিমাণ মতো খাবেন।

সিজারের পর কি কি ফল খাওয়া যাবে?
এসময়ে ভিটামিন সি জাতীয় ফল মায়েদের জন্য বেশ উপকারী। ভিটামিন সি ক্ষতস্থান দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। যেমন: আনারস, কমলা, জাম্বুরা, পেয়ারা, লেবু, মাল্টা, আঙ্গুর, পেঁপে, জামে অনেক ভিটামিন সি রয়েছে। ডাবের পানি, তরমুজ, কলা, বেদানা, কমলা, কিশমিশে পটাশিয়াম বেশি থাকে। আসলে আমাদের পরিচিত সব ধরনের ফল হল পুষ্টিকর খাবার।

সিজারের কতদিন পর মিষ্টি খাওয়া যায়?
মিষ্টিতে প্রচুর ক্যালরি থাকে যা সিজারিয়ান মায়েদের পরিহার করা উচিত। ডায়াবেটিস না থাকলেও অপারেশনের পর মিষ্টি ও অত্যাধিক চিনি যুক্ত যেকোন খাবার রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। সিজারের পর মিষ্টি ও চিনি জাতীয় খাবার খেলে ক্ষত শুকাতে দেরি হতে পারে।

তবে ক্ষত নিরাময়ের পর ডাক্তার যদি আপনাকে সুস্থ বলে দেয় তাহলে কিছুটা মিষ্টি খেতে পারবেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *