বুকের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ এবং করণীয়।

বুকের বাম পাশে ব্যথা হলে আমরা সচরাচর সেটিকে হার্টের ব্যথা বলেই মনে করে থাকি। এটি হৃদরোগ বা হার্টের সমস্যার একটি লক্ষণ হলেও অন্য কারনে বুকের এই স্থানে ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের কারণে বুকে ব্যথা হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে ব্যথার সাথে অন্যান্য উপসর্গ আছে কিনা। যেমন: বমি বা বমি বমি ভাব, প্রচন্ড ঘাম, বুকে কেউ চেপে ধরে রেখেছে এমন অনুভূতি।

ব্যথার প্রকৃতি বা ধরন কি রকম তার উপর নির্ভর করে ব্যথার কারণ বুঝা যায়। চিকিৎসকরা প্রকৃত কারন নির্নয় করতে ব্যথার স্থান ও ধরনের উপর গুরুত্ব দেয়। যাইহোক এই পোস্টটিতে বুকের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার সম্ভাব্য কারো সমূহ জানানো হয়েছে।

বুকের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ

বুকে ব্যথা হলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। মনে রাখবেন, হৃদরোগের কারণেও বুকের বাম দিকে ব্যথা হয়। হার্টের ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা মনে করে ভুল করলে বিপদ হতে পারে। বুকে ব্যথার কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে-

অ্যানজাইনা

বুকের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার কারণ

অ্যানজাইনার কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে। অ্যানজাইনা আসলে কোনো রোগ নয়। করোনারি হার্ট ডিজিজ বা কিছু হার্টের রোগের উপসর্গ। অ্যানজাইনা মূলত কতগুলো লক্ষণ এর সমষ্টি যেমনঃ 

  • বুকে চাপ অনুভূত হওয়া
  • বুকে ব্যথা
  • শ্বাসকষ্ট থাকা
  • বা-হাতে, চোয়ালে এবং কাঁধে ব্যথা অনুভূত হওয়া
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
  • অস্বস্তি বোধ করা, ইত্যাদি।

অ্যানজাইনা মূলত দুই ধরনের হয়। একটি হলো অস্থায়ী অ্যানজাইনা বা অ্যানজাইনা পেকটোরিস এবং অপরটি স্ট্যাবল অ্যানজাইনা।

হার্ট অ্যাটাক

হার্ট অ্যাটাকের কারণে বুকে ব্যথা হয়। ব্যথা বুকের বা পাশে অথবা বুকের মাঝখানে ‌অনুভূত হতে পারে। ব্যথা তীব্র হয় তবে প্রথমে বুকে মৃদু ব্যথা হয় যা পরবর্তীতে তীব্র ব্যথায় পরিণত হয় এবং হার্ট অ্যাটাকের অন্য লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। হার্ট অ্যাটাকের অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • বুকে প্রচণ্ড চাপ এবং ব্যথা
  • শ্বাসকষ্ট
  • বা-হাতে ব্যাথা, ব্যথা কাঁধে, চোয়ালে, পিঠে এমনকি ডান হাতে পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • পেটে ব্যথা হতে পারে
  • বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া
  • মাথায় হালকা ব্যথা এবং মাথা ঘোরা

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ গুলো সবার ক্ষেত্রে এক হয় না। বুকের বা পাশে অথবা মাঝখানে ব্যথা, চাপ, শ্বাসকষ্ট এবং বমি বমি ভাব হওয়া বা বমি করা হার্ট অ্যাটাকের একটি কমন উপসর্গ। তাই আপনার আশেপাশে কারো মধ্যে এই লক্ষণ গুলো প্রকাশ পেলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে অথবা একজন হূদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট যাওয়ার পরামর্শ দিন।

মায়োকার্ডাইটিস

মায়োকার্ডাইটিস হার্টের পেশীগুলির প্রদাহজনিত একটি রোগ। একে মায়োকার্ডিয়ামও বলা হয়। এই রোগে হার্টের প্রদাহের পাশাপাশি আরো কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। যেমনঃ অস্বাভাবিক হার্টবিট বা অ্যারিথমিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্ত লাগা।

আরও পড়ুন মিল্ক শেক এর উপকারিতা, অপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মায়োকার্ডাইটিস হলে হার্টের পেশিগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। মায়োকার্ডাইটিস অনেক সময় এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

কার্ডিওমায়োপ্যাথি

কার্ডিওমায়োপ্যাথি একটি হার্টের অসুখ। হার্ট রক্ত পাম্প করে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়। কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগে হার্টের রক্ত পাম্প করতে অসুবিধা হয়। হার্ট অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোন উপসর্গ ছাড়াই কার্ডিওমায়োপ্যাথি হতে পারে। আবার কখনো কখনো বুকের বাম পাশে ব্যথা সহ আরো কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। যেমনঃ

  • শ্বাসকষ্ট
  • মাথা ঘোরানো
  • অনিয়মিত হার্টবিট
  • পায়ের গোড়ালি, হাত-পা বা পেট ফুলে যাওয়া।

পেরিকার্ডাইটিস

হার্ট বা হৃদপিণ্ডকে ঘিরে রাখে দুটি পাতলা পর্দা যাকে পেরিকার্ডিয়াম বলা হয়। এই পেরিকার্ডিয়ামে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ হলে তাকে পেরিকার্ডাইটিস বলে। পেরিকার্ডাইটিস হলে বুকের মাঝখানে অথবা বা পাশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথা বা কাঁধে এমন কি ডান কাঁধে পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। পেরিকার্ডাইটিস এর উপসর্গ গুলো অনেকটা হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ গুলির মত হয়।

প্যানিক অ্যাটাক

প্যানিক অ্যাটাক একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। বুক ধড়ফড় করা ও বুকে ব্যথা এই রোগের একটি উপসর্গ। তীব্র মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও ভয়-ভীতি থেকে এই রোগ হয়। প্যানিক অ্যাটাকে বুকে ব্যথা ছাড়া অন্য যেসব লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • শ্বাসকষ্ট
  • দ্রুত হৃদস্পন্দন বা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া
  • মাথা ঘোরানো এবং শরীর কাঁপা
  • আশেপাশের সব কিছু অবাস্তব লাগা
  • বমি বমি ভাব
  • দম বন্ধ হয়ে যাবে এমন মনে হওয়া 
  • কোন কিছু নিয়ে তীব্র ভয়

প্যানিক ডিসঅর্ডার একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তাই দ্রুত একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত। প্যানিক ডিসঅর্ডার থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তার সাইকোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে, যাইহোক ডাক্তারের নির্দেশমতো নিয়ম অনুযায়ী লাইফ স্টাইল পরিচালনা করা উচিত।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা GERD

গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ সংক্ষেপে যাকে GERD বলা হয়। GERD লক্ষণগুলোকে অনেকে হার্টের অসুখ মনে করে ভুল করে থাকে। এই রোগের উপসর্গ গুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • খাবার খাওয়ার পর বুকে ব্যথা
  • বুকে বা পেটে জ্বালাপোড়া করা
  • হেঁচকি ওঠা ও গিলতে সমস্যা 
  • টক ঢেকুর ওঠা, মুখে বাজে গন্ধ ও টক স্বাদ অনুভূত হওয়া। পেটের এসিড মুখে চলে আসার কারণে এমনটা হয়।

খাবার খাওয়ার পর পেটে এসিড বেড়ে যায় যাকে হাইপার এসিডিটি বলা হয়। আর এই কারনেই GERD এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। 

খাদ্য নালীর সমস্যা

খাদ্য নালীর কিছু সমস্যার কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে। যেমনঃ

  • খাদ্যনালীর পেশিতে খিঁচুনি হলে বুকে ব্যথা অনুভূত হয়। খাদ্যনালীর পেশিতে খিঁচুনি হলে যে ব্যাথা হয় সেটা অনেকটা হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকে যে ব্যথা হয় তার মতো হতে পারে।
  • ইসোফ্যাগাইটিস এর কারণে বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথা হতে পারে।

পালমোনারি হাইপারটেনশন

পালমোনারি হাইপারটেনশন হল ফুসফুসের উচ্চ রক্তচাপ। পালমোনারি হাইপারটেনশন এর কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে। বুকে ব্যথার পাশাপাশি অন্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • শ্বাসকষ্ট
  • দুর্বল লাগা
  • মাথা ঘোরানো এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। 

সময়মতো চিকিৎসা না করা হলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শুরু হয় এবং হার্ট ফেইলিওর পর্যন্ত হতে পারে।

পালমোনারি এমবোলিজম

পালমোনারি এমবোলিজম একটি ফুসফুসের সমস্যা জনিত রোগ। পালমোনারি এমবোলিজম হলে ফুসফুসে রক্ত জমাট বেধে যায়। এ রোগে হঠাৎ করে বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব হয়। পাশাপাশি আরও কিছু লক্ষণ থাকতে পারে। যেমনঃ

  • শ্বাসকষ্ট
  • পিঠে ব্যথা
  • হালকা মাথাব্যথা

পালমোনারি এমবোলিজম হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এছাড়া নিউমোনিয়া,ব্রঙ্কাইটিস এবং ফুসফুসের অন্যান্য সংক্রমণ জনিত রোগেও বুকে ব্যথা হতে পারে।

বুকের বাম পাশে ব্যথা হলে করণীয়

বুকের বাম পাশে এবং বুকের মাঝখানে হার্টের সমস্যার কারণে ব্যথা হতে পারে। হার্টের অসুখ বা হার্টের সমস্যা ছাড়াও অন্যান্য কারণেও বুকের বাম পাশে এবং বুকের মাঝখানে ব্যথা হতে পারে যা আমরা উপরের আলোচনা থেকে জানতে পেরেছি। আপনার যদি বুকের বাম পাশে ব্যথা অনুভূত হয় তাহলে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত। ডাক্তার আপনার ব্যথার কারণ খুঁজে বের করবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। সামান্য অসাবধানতা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আমাদের সব সময় সচেতন থাকতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *