জেনে নিন ফলিক এসিড থাকে কোন কোন খাবারে।

ফলিক এসিড ডিএনএ গঠন, কোষ বিভাজন ও ডিএনএ মেরামতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ক্রমাগত কোষের বিভাজন ও বৃদ্ধিতে প্রয়োজন এই ভিটামিন। তাই গর্ভবতী মা ও নবজাতকের জন্য ফলিক এসিড অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। এই ভিটামিন লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এর অভাবে দেখা দেয় ফলিক এসিডের অভাব জনিত রক্ত স্বল্পতা।

ফলিক এসিড জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমায়। এটি হৃদরোগ ও কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজন এই ভিটামিনের। এক কথায়, ফলিক এসিডের রয়েছে অনেক উপকারিতা। তাই আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলিক এসিড যুক্ত খাবার খেতে হবে।

ফলিক এসিড কোন ভিটামিন?

ফলিক এসিড হলো একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। এটি ফোলেট এর সিন্থেটিক ভার্সন বা কৃত্রিম সংস্করণ। ফোলেট এর অপর নাম ভিটামিন বি নাইন। ফোলেট বা ভিটামিন বি নাইন হল ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত একটি ভিটামিন।

ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার তালিকা।

বিষয়টি স্পষ্ট যে, ফলিক এসিড হলো একটি ভিটামিন যা ফোলেট বা ভিটামিন বি নাইন এর একটি কৃত্রিম সংস্করণ। তাই আমরা ধরে নিতে পারি ফলিক এসিড হলো ভিটামিন বি নাইন বা ফোলেট এর একটি রূপ।

ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার

ফোলেট এবং ফলিক এসিড নাম দুটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ফোলিয়াম থেকে। ফোলিয়াম ল্যাটিন শব্দের অর্থ হলো পাতা। সবুজ পাতা যুক্ত শাকসবজি হলো এই ভিটামিনের সবচেয়ে বড় উৎস।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৪০০ মাইক্রগ্রাম ফলিক এসিড প্রয়োজন। তবে একজন গর্ভবতী মহিলার এর দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রা হলো ৬০০ মাইক্রোগ্রাম। এই ভিটামিন আমাদের দেহে নিজ থেকে তৈরি হয় না। তাই নির্ভর করতে হয় ফলিক এসিড যুক্ত খাবার গুলোর উপরে। ্

উচ্চমাত্রায় ফোলেট সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে:

১.লেগুম

লেগুম হল Fabaceae গোত্রের যেকোনো উদ্ভিদের ফল বা বীজ। যেমন: শিম, মটরশুটি,মাসকলাই,মসুর ডাল, মুগের ডাল, মটর ইত্যাদি হল লেগুম। প্রতিটি লেগুম জাতীয় খাবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফোলেট থাকে।

যেমন: ১ কাপ বা ১৭৭ গ্রাম রান্না করা কিডনি বিনে ১৩১ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড থাকে, যা আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ৩৩ শতাংশ। কিডনি বিন হলো এক ধরনের শিমের বিচি। দেখতে অনেকটা কিডনির মতো হয়, তাই এর এমন নাম দেওয়া হয়েছে।

আবার ১ কাপ বা ১৯৮ গ্রাম রান্না করা মসুর ডালে ৩৫৮ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে, যা আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ৯০ শতাংশ।

লেগুম জাতীয় খাবার গুলো প্রোটিন, ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখুন লেগুম জাতীয় খাবার।

২.অ্যাসপারাগাস

আমাদের দেশে অ্যাসপারাগাস এর পরিচিতি খুব কম। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এটি একটি পরিচিত সবজি। বর্তমানে আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে অ্যাসপারাগাস পাওয়া যায়। অ্যাসপারাগাসে ফোলেট সহ প্রচুর ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান রয়েছে।

৯০ গ্রাম রান্না করা অ্যাসপারাগাসে প্রায় ১৩৪ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে, যা আমাদের প্রতিদিনের চাহিদার ৩৪ শতাংশ। অ্যাসপারাগাস প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি সবজি। এতে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান রয়েছে।

৩. ডিম

ফোলেটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে ডিমে। ১ টি বড় সাইজের ডিমে ২২ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে যা আমাদের দৈনিক চাহিদার ৬ শতাংশ। ডিমে রয়েছে প্রোটিন, সেলেনিয়াম, রিবোফ্লেভিন এবং ভিটামিন বি টুয়েলভ। আমাদের শরীরের জন্য ফোলেটের মত এই পুষ্টি উপাদান গুলোর দরকার রয়েছে।

তাছাড়া ডিমে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লুটেইন এবং জিক্সানথিন রয়েছে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দুটি ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো চোখের রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

৪.সবুজ শাকসবজি

সবুজ শাকসবজিতে ক্যালোরি খুব কম থাকে। সবুজ শাকসবজি যেমন: পালং শাক,বাঁধাকপি, ফুলকপি, পুঁইশাক, মটরশুঁটি এবং সবুজ পাতাযুক্ত সব ধরনের শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। তাই প্রতিদিন সবুজ শাকসবজি খাওয়া উচিত।

সবুজ শাকসবজিতে ভিটামিন এ,ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ফোলেট ও কয়েক ধরনের ভিটামিন বি থাকে। এতে আরো রয়েছে আয়রন পটাশিয়াম ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম। গাঢ় সবুজ রঙের শাকসবজিতে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন থাকে।

৩০ গ্রাম রান্না করা পালং শাকে ৫৮.২ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন দরকারি ফোলেট এর মাত্রার ১৫ শতাংশ।

সবুজ শাকসবজিতে  লুটেইন নামের একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা চোখের জন্য উপকারী। তাছাড়া সবুজ শাকসবজি স্তন ক্যান্সার ও প্রোস্টেট গ্রন্থির ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক কথায়, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও কয়েকটি অতিপ্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের জন্য প্রতিদিন সবুজ শাকসবজি খেতে হবে।

৫.সাইট্রাস ফল

প্রায় সব ধরনের সাইট্রাস ফল স্বাদ ও পুষ্টিগুনে ভরপুর। কমলালেবু, জাম্বুরা, লেবু ও অন্যান্য সাইট্রাস ফলে ফোলেট থাকে। একটি বড় কমলাতে প্রায় ৫৫ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। যা আমাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ১৪ শতাংশ।

সাইট্রাস ফল আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কারণ এতে রয়েছে ভিটামিন সি। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে সাইট্রাস ফল খেলে অগ্নাশয়, পাকস্থলী ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যা গবেষণায় প্রমাণিত।

৬. বাদাম ও দানাদার খাবার

বাদাম ও অন্যান্য দানাদার খাবার প্রোটিনের একটি বড় উৎস। প্রোটিন ছাড়া বাদামে আরো রয়েছে ফাইবার, কয়েক ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। ১০০ গ্রাম আখরোটে প্রায় ৯৮ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। ১০০ গ্রাম চিনা বাদামে প্রায় ২৪৬ মাইক্রো গ্রাম ফোলেট থাকে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রার ৬২ শতাংশ।

তাই প্রতিদিনের ফলিক এসিডের চাহিদা মেটাতে খাদ্য তালিকায় রাখুন বাদাম ও অন্যান্য দানাদার খাবার। পাশাপাশি ফাইবার, প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদান পাবেন।

৭. গরুর কলিজা

যে খাবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি ফোলেট থাকে গরুর কলিজা সেগুলোর মধ্যে একটি। ১০০ গ্রাম রান্না করা গরুর কলিজাতে প্রায় ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। ফোলেট ছাড়াও গরুর কলিজাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি টুয়েলভ ও কপার।

টিস্যু গঠন, মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম ও হরমোন উৎপাদনে প্রয়োজন প্রোটিন। গরুর কলিজা যেন প্রোটিনের একটি ভান্ডার। মাত্র ১০০ গ্রাম গরুর কলিজা থেকে প্রায় ২৮ গ্রাম প্রোটিন পাবেন। অতি প্রয়োজনীয় এসব পুষ্টি উপাদান পেতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখুন কলিজা।

৮. পেঁপে

পেঁপে আমাদের দেশে সারা বছর কম বেশি পাওয়া যায়। কাঁচা পেঁপে সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। আর পাকা পেঁপে ফল হিসেবে খাওয়া হয়। ১০০ গ্রাম কাঁচা পেঁপেতে প্রায় ৩৮ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে।

আরও পড়ুন জন্ডিস রোগীর খাবার তালিকা।

পেঁপেতে ভিটামিন সি, পটাসিয়াম এবং ক্যারোটিনয়েডের থাকে। পেঁপেতে পেপেন নামক এক ধরনের এনজাইম থাকে যা হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতার কথা বিবেচনায় পেঁপে খেতে পারেন।

৯.কলা

কলাকে বলতে পারেন পুষ্টির পাওয়ার হাউস। কেননা কলা নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর। কলাতে ফোলেট থাকে, কিন্তু ফোলেট এর দৈনিক চাহিদা মেটাতে কলা যথেষ্ট নয়। অন্যান্য ফোলেট সমৃদ্ধ খাবারের সাথে কলা খেলে খুব সহজেই ফোলেট বা ফলিক এসিডের চাহিদা পূরণ হবে।

১টি মাঝারি সাইজের কলাতে প্রায় ২৪ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। কলায় আরো রয়েছে পটাসিয়াম, ভিটামিন বি সিক্স এবং ম্যাঙ্গানিজ সহ বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান।

১০. ব্রকলি

ব্রকলি হলো শীতকালীন সবজি। আমাদের দেশে এটি সবুজ ফুলকপি নামে অনেকের কাছে পরিচিত। ফোলেট এর পাশাপাশি ব্রোকলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফাইবার, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন সি, কে এবং এ।

১০০ গ্রাম ব্রকলিতে প্রায় ৬২ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে। তাছাড়া ব্রকলির রয়েছে নানা স্বাস্থ্য উপকারিতা। যেমন: এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কয়েক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *