গর্ভাবস্থায় কতবার ও কোন সময়ে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা উচিত।

গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানার জন্য বেশকিছু পরীক্ষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু ফিজিক্যাল ও কিছু মেডিকেল চেকআপ। মেডিকেল চেকআপ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মাধ্যমে করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম একটি অতি পরিচিত পরীক্ষা। একজন গর্ভবতীর জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হল কখন ও কেন এই পরীক্ষাটি করা উচিত।

গর্ভের সন্তানের জেন্ডার অর্থাৎ ছেলে হবে কিনা মেয়ে হবে তা জানার জন্য আল্ট্রা করার বেশ জনপ্রিয়তা থাকলেও এই পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভ সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের উপর এর কোন ক্ষতিকর প্রভাব নেই তাই এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি কি?

গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাম কখন ও কেন করবেন।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা সোনোগ্রাফি, ডায়াগনস্টিক মেডিকেল সোনোগ্রাফি এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম নামেও পরিচিত। এটি মূলত একটি ইমেজিং পদ্ধতি যার মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে দেহের অভ্যন্তরীণ ছবি দেখা যায়।

গর্ভাবস্থায় কেন আল্ট্রাসনোগ্রাম করা উচিত?

আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই নিরাপদ। গর্ভাবস্থায় এই পরীক্ষা করে বিকাশমান শিশু সম্পর্কে জানা যায়। অর্থাৎ ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটছে কিনা এবং সম্ভাব্য কোন জটিলতা আছে কিনা সেটা জানা যায়। তাছাড়া গর্ভবতীর ফিজিক্যাল পরীক্ষায় কোন অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে একজন ডাক্তার আল্ট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দিতে পারে। গর্ভের শিশুর লিঙ্গ সম্পর্কেও জানা যায় এই টেস্ট করে।

গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাম কখন করবেন

গর্ভবতীদের তিনবার আলট্রা করার পরামর্শ দেয়া হয়।

প্রথম ত্রৈমাসিকে

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস বা ১২ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে উত্তম সময় হলো ১০ সপ্তাহ পর। এ সময়ে বেশ কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। যেমন:

  • গর্ভাবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়
  • শিশুর গর্ভকালীন বয়স ও প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে অনুমান করা যায়
  • জমজ শিশু থাকলে তা জানা যায়
  • ভ্রূণের হৃদস্পন্দন
  • ভ্রূনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
  • অ্যাক্টোপিক প্রেগন্যানসি

গর্ভধারণের সঠিক স্থান হলো জরায়ু। কোন কারণে জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ হলে তাকে অ্যাক্টোপিক গর্ভধারণ বলে। এতে শিশুটি অপরিণত অবস্থায় মারা যায়। সঠিক সময়ে সুচিকিৎসা না হলে মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে

গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় বা ১২ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়টা হল দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক। ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে দ্বিতীয় আল্ট্রাসাউন্ড করা ভালো। এসময়ে শিশুর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখা যায় ও জরায়ুতে অ্যামনিওটিক তরলের পরিমাণ জানা যায়।

  • জন্মগত অস্বাভাবিকতা বা ত্রুটি থাকলে জানা যাবে
  • অ্যামনিওটিক তরলের মাত্রা পরিমাপ করা যায়
  • ভ্রূণ তার প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন পাচ্ছে কিনা
  • ডিম্বাশয় বা জরায়ুতে কোন সমস্যা আছে কিনা। যেমন: ফাইব্রয়েড ইউটেরাস, টিউমার ইত্যাদি।
  • ছেলে শিশু নাকি মেয়ে শিশু হবে এই সময়ে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে জানা যায়।
  • ডাউন সিনড্রোমের সমস্যা আছে কিনা বোঝা যায়।

তৃতীয় ত্রৈমাসিকে

থার্ড ট্রাইমেস্টারের শেষ পর্যায়ে বা ৩৬ থেকে ৩৮ সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় আল্ট্রাসাউন্ড করতে হয়। প্লাসেন্টা প্রিভিয়া এবং প্ল্যাসেন্টাল অ্যাব্রাপেশন এর মতো সমস্যা নির্নয় করতে এই পরীক্ষা করা খুব জরুরি। যখন প্রসবের আগে জরায়ু থেকে প্লাসেন্টা আলাদা হয়ে যায় তাকে প্ল্যাসেন্টাল অ্যাব্রাপেশন বলে। প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হলে গর্ভফুল জরায়ুকে ঢেকে রাখে। তাছাড়া সার্ভিক্সের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা যায় এবং ২য় ত্রৈমাসিকে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে যে রিপোর্ট পাওয়া যায় সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে ।

আরো পড়ুন ডাক্তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর চেক করার নিয়ম।

এক কথায় স্বাভাবিক প্রসব না সিজার হবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তৃতীয় ত্রৈমাসিকে আল্ট্রাসাউন্ড করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আল্ট্রাসাউন্ড করার আগে প্রস্তুতি

গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে আল্ট্রাসাউন্ড করার আগে প্রস্রাবের চাপ থাকলে রিপোর্ট পরিষ্কার আসে। তাই এই সময়ে প্রস্রাব করা যাবে। যদি প্রস্রাবের চাপ না থাকে তাহলে আল্ট্রা করার ১ ঘন্টা আগে ৩ থেকে ৪ গ্লাস পানি পান করতে হবে।

পেটে আল্ট্রাসাউন্ড করার জন্য বুকের নিচ থেকে সম্পূর্ণ পেটের কাপড় সরিয়ে ফেলতে হবে। এজন্য অস্বস্তি বোধ হতে পারে। মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করার নিয়ম

গর্ভাবস্থায় সাধারণত দুই ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড করা যায়। যোনীতে আল্ট্রাসাউন্ড ও পেটে আল্ট্রাসাউন্ড।

ট্রান্সভ্যাজিনাল আল্ট্রাসাউন্ড

যোনিতে একটি ছোট আল্ট্রাসাউন্ড প্রোব প্রবেশ করিয়ে যোনিতে আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়। পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় তাই গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে করা হয়। গর্ভাবস্থা ছাড়াও বেশ কিছু রোগ যেমন: পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ (পিআইডি), সার্ভিসাইটিস নির্নয় করতে এই পরীক্ষাটি করা হয়।

পেটের আল্ট্রাসাউন্ড

এই পরীক্ষা পেটের উপর দিয়ে করা হয়। পেটে এক ধরনের ঠান্ডা জেল লাগিয়ে ত্বকের উপর প্রোব দিয়ে পেটের বিভিন্ন স্থানে চাপ দেয়া হয়। এতে তেমন কোন ব্যথা হয় না। জেল লাগানোর কারণে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হয় না তবে কিছুটা ঠান্ডা অনুভূত হয়।

প্রোব থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সি শব্দ তরঙ্গ বের হয় যা আমরা কানে শুনতে পাই না। এই শব্দ তরঙ্গ নরম মাংস ভেদ করতে পারে কিন্তু হাড়ে বাধা পেয়ে ফিরে আসে। তাই এই পরীক্ষা করার সময় শব্দ তরঙ্গ শিশুর শরীরে বাধা পেয়ে ফিরে আসে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন বাধা পেয়ে ফিরে আসা এই শব্দ তরঙ্গ গুলোকে প্রসেস করে ভিডিও ছবিতে পরিবর্তিত করে।

কম্পিউটার স্ক্রিনে পেটের শিশুর নড়াচড়া, বিভিন্ন অঙ্গের ছবি, জরায়ুর ছবি দেখা যাবে। আল্ট্রাসাউন্ড চলাকালীন সময়ে আপনাকে বিছানায় আরাম দায়কভাবে শুয়ে থাকতে হবে। পরীক্ষা শেষে পেটে লেগে থাকা জেল মুছে দিবে।

ভ্রূণের ইকোকার্ডিওগ্রাফি

শিশুর জন্মগত হার্টের ত্রুটি থাকতে পারে সন্দেহে ফিটাল ইকো টেস্ট করা হয়। এটি গর্ভাবস্থার আল্ট্রাসাউন্ডের মতোই করা হয়। তবে সময় একটু বেশি লাগে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভ্রূণের হৃৎপিণ্ডের একটি গভীর ছবি পাওয়া যায়। এই ছবি থেকে হৃদপিন্ডের আকার, আকৃতি এবং গঠন দেখা যায়।

শিশুর হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কিনা ভ্রূণের ইকো টেস্ট করে জানা যায়। এককথায় এই পরীক্ষা ভ্রূনের হার্টের সমস্যা নির্ণয় করতে সাহায্য করে।

আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট দেখে ছেলে না মেয়ে বোঝার উপায়

আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে সব সময় ছেলে না মেয়ে সন্তান হবে উল্লেখ থাকে না। তবে একজন ডাক্তার এইটা বুঝতে পারে। গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ জানতে চাইলে পরীক্ষা করার সময় ডাক্তার থেকে জেনে নিতে হবে।

রিপোর্টের ডেসক্রিপশন অংশে যদি gender m,male বা XY লেখা থাকে তাহলে বুঝতে হবে ছেলে সন্তান। আর gender N, girl, female বা XY লিখা থাকলে বুঝতে হবে মেয়ে সন্তান।

আল্ট্রাসনোগ্রাম কি খালি পেটে করতে হয়?

একবারে খালি পেটে করতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। আপনি ১ম ত্রৈমাসিকে আল্ট্রা করাতে চাইলে প্রস্রাবের বেশ চাপ থাকতে হবে। পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রস্রাব আটকে রাখতে হবে। যদি প্রস্রাবের চাপ না থাকে তাহলে পরীক্ষাটি করার ১ ঘন্টা আগে দুই তিন গ্লাস পানি বা তরল খাবার খেতে হবে। স্পষ্ট রিপোর্ট পেতে ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় কোন রেডিয়েশন থাকে না। তাই মা ও শিশুর জন্য এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু মনে রাখবেন প্রয়োজন ছাড়া এই পরীক্ষা করা উচিত নয়। এই পোস্টটিতে গর্ভাবস্থায় আলট্রাসনোগ্রাফি করার সঠিক সময় তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি নতুন নতুন তথ্য পেতে আমাদের সাথেই থাকবেন। এই পোস্ট সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে আমাদের জানাতে পারেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *