কোন কোন খাবারে ইনসুলিন তৈরি হয়?

সাধারণত শ্বেতসার বিহীন সবজি বা সালাদ, হোল গ্রেইন বা গোটা শস্য এবং সাইট্রাস জাতীয় ফলগুলো ইনসুলিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিস্তারিত জানতে হলে এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বুঝে শুনে খাবার খাওয়া। এমন কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ায় এবং গ্লুকোজের মাত্রা কমায়। যারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত এই খাবার গুলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে তাদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা করে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এমন খাবার গুলো সম্পর্কে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীর যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না তখন তাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলে। এর ফলে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় টাইপ 2 প্রি-ডায়াবেটিক।

কোন কোন খাবারে ইনসুলিন তৈরি হয়

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কি?

এ পর্যায়ে আমরা জানবো ইনসুলিন এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে। ইনসুলিন হলো এক ধরনের হরমোন যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। রক্ত থেকে গ্লুকোজ কে শরীরের কোষ কলায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে ইনসুলিন। এই গ্লুকোজ ব্যাবহার করে শরীর শক্তি উৎপাদন করে।

শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি না হলে আমাদের যে কোষ রয়েছে সেগুলো সঠিকভাবে গ্লুকোজ গ্রহণ করতে পারেন না। এক কথায় যদি বলি, শরীরের কোষগুলি কার্যকরভাবে ইনসুলিন ব্যবহার করতে না পারার কারণ হল ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।

আমাদের বাম পাশে পাঁজরের নিচে পেটের উপরিভাগে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস নামের একটি অঙ্গ থাকে। অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়। অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেশ কয়েকটি রোগের জন্য দায়ী।

ইনসুলিন তৈরি হয় যেসব খাবারে

বিশেষজ্ঞদের মতে হেলদি ফ্যাট ও প্রোটিন জাতীয় খাবার গুলো বেশি মাত্রায় ইনসুলিন তৈরিতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হেলদি ফ্যাট ও প্রোটিন যুক্ত খাবার গুলো কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের বিকল্প হিসেবে খেতে হবে।

হজমের সময় প্রোটিন ভেঙে গিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিনত হয়। এই অ্যামিনো অ্যাসিড অধিক পরিমাণে ইনসুলিন তৈরিতে অগ্ন্যাশয়কে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিন যেমন: মসুর ডাল, মটরশুঁটি, চিয়া সিড ইত্যাদি ইনসুলিন বৃদ্ধিতে বেশি কার্যকর।

শরীরে ইনসুলিন তৈরি যেন কমে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে ইনসুলিন বান্ধব খাবার খেতে হবে। প্রোটিন ও হেলদি ফ্যাটের পাশাপাশি  ইনসুলিন সেনসিভিটি বাড়াতে খেতে হবে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফাইবার এবং পটাসিয়াম যুক্ত খাবার গুলো।

সবুজ শাকসবজি

গাঢ় সবুজ শাকসবজি যেমন: পালং শাক, লাউ শাক, কুমড়া শাক ইত্যাদি শাক ও সবজিতে ক্যালোরি ও কার্বোহাইড্রেট খুবই কম থাকে। আমাদের শরীরের জন্য দরকারি নানা ধরনের পুষ্টিতে ভরপুর থাকে সবুজ শাক ও সবজি।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একদম উপযুক্ত খাবার হলো সবুজ শাকসবজি। খাওয়া যায় বেশি করে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাওয়ার ভয় নেই।

পুষ্টিবিদদের মতে একজন মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার খেলে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। ফাইবার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শাক সবজিতে থাকে প্রচুর পরিমানে ফাইবার। তাই ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকায় শাকসবজি রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

স্টার্চি সবজিগুলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়। ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে সব ধরনের স্টার্চি খাবার এড়িয়ে চলুন। যেমন: ভুট্টা, সাদা আলু, মিষ্টি আলু, সবুজ মটর, বীট মূল ইত্যাদি খাবারে স্টার্চ বেশি থাকে।

আমিষ জাতীয় খাবার

প্রোটিন ইনসুলিন তৈরি ও নিঃসরণ বৃদ্ধি করে যা আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। ইনসুলিন উৎপাদন বাড়াতে প্রানিজ প্রোটিন ও উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিন দুটোই খেতে হবে। উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিন জাতীয় খাবার গুলো বেশি সুবিধা দিবে।

আরও পড়ুন দাঁতের মাড়িতে পুঁজ হলে করনীয়, খুব সহজ সমাধান।

টার্কির মাংস, মুরগির মাংস, ডিম, মাছ, টক দই হল প্রানিজ প্রোটিনের ভালো উৎস। গরু বা খাসির মাংসে প্রচুর প্রোটিন থাকলেও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এগুলো নিরাপদ নয়। গরু বা খাসির মাংসে প্রচুর ফ্যাট থাকে যার কারণে ডাক্তাররা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগীদের খেতে নিষেধ করেন।

উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিনের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের বাদাম ও বীজ। যেমন: পেস্তা বাদাম, চিনা বাদাম, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, কুমড়ো বীজ, তিলের বীজ, তিসি বীজ, চিয়া বীজ ইত্যাদি।

বাদাম ও বীজে থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। যা রক্তে কোলেস্টেরল ও শর্করার মাত্রা কমায়। প্রোটিন ও ফাইবার একসাথে পেতে উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিন জাতীয় খাবারের প্রতি একটু বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার।

স্বাস্থ্যকর চর্বি

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে পারে হেলদি ফ্যাট। ট্রান্স ফ্যাট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি সহ নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। কোন খাবারের ট্রান্স ফ্যাট থাকলে নিঃসন্দেহে সেটা অস্বাস্থ্যকর খাবার।

অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে স্বাভাবিকভাবেই অগ্ন্যাশয়ের বারোটা বাজবে। অগ্ন্যাশয় অসুস্থ হলে ইনসুলিন উৎপাদন কমে যাবে। তাই অগ্ন্যাশয়কে ড্যামেজ থেকে রক্ষা করতে ট্রান্স ফ্যাট যুক্ত সব ধরনের খাবার বাদ দিতে হবে। সিঙ্গারা, পুরি, সমুচা, পেয়াজু বা যেকোনো ভাজাপোড়া খাবার ও ফাস্টফুড খাওয়া একেবারে ছেড়ে দিন।

হেলদি ফ্যাট বা স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গুলো সবার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আছে হেলদি ফ্যাট তাদের ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায়। অ্যাভোকাডো, ঘি, মাখন টক দই, অলিভ অয়েল, তিলের তেল জাতীয় খাবার থেকে পর্যাপ্ত হেলদি ফ্যাট পাবেন।

ইনসুলিন কম হলে কি হয়?

শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে দেখা দিতে পারে নানা ধরনের সমস্যা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস দেখা দেয় এর কারণে। দিনের পর দিন যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করা হয় তাহলে দেখা দেয় জটিল সব শারীরিক সমস্যা। যেমন: গ্লুকোমা, কিডনি রোগ, চর্মরোগ, ঘন ঘন প্রস্রাবে ইনফেকশন ইত্যাদি।

ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই সহজেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আসলে ডায়াবেটিস রোগের মূল কারণ হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক বছর আগে থেকেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে। আর এই বিষয়টা আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারে না।

অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম না করা, ব্যায়াম না করা, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, তেল চর্বিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ইত্যাদি কারণে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমে আমাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ করতে হবে। তাই খেতে হবে প্রোটিন, হেলদি ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার। যেমন: শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, কম ফ্যাট যুক্ত মাংস ইত্যাদি।

প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হবে এবং কমপক্ষে ৭ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। অ্যালকোহল ও তামাক সেবন একেবারে নিষেধ। প্রসেস করা খাবার, প্যাকেটজাত ও ক্যান করা খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও চিনি দিয়ে বানানো খাবার এবং ফাস্টফুড খাওয়া যাবেনা।

শেষ কথা

যদি সংক্ষিপ্ত করে বলি, ইনসুলিন আমাদের শরীরে তৈরি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এর কারণে হয় নীরব ঘাতক রোগ ডায়াবেটিস।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় চলতে হবে। এখানে যেসব খাবার সম্পর্কে জানানো হয়েছে এগুলো ইনসুলিন উৎপাদন ও নিঃসরণ বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া এই খাবারগুলো কম ক্যালরির পুষ্টিকর খাবার। তাছাড়া এই খাবারগুলো শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতেও কার্যকর।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *