ইসিজি রিপোর্ট বোঝার উপায়। হার্ট ভালো না খারাপ বুঝবেন যেভাবে।

হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে ইসিজি একটি পরিচিত শব্দ। ইসিজি হলো একটি মেডিকেল টেস্ট এর সংক্ষিপ্ত নাম যার পূর্ণ নাম হলো ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম। একটি ডিভাইসের মাধ্যমে শরীরে ইলেকট্রিক সিগন্যাল পাঠিয়ে এর সাহায্যে হার্টের কন্ডিশন সম্পর্কে জানা হয়। হার্টের অসুখ সনাক্ত করতে এই টেস্ট করা হয়।

হার্টের অসুখ নির্ণয়ের জন্য এটি একটি কমন টেস্ট। এই টেস্ট করতে রোগীর কোন ব্যথা অনুভব হয় না। দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যায় এবং কার্ডিয়াক হেলথ সম্পর্কে জানা যায়। ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতালে ইসিজি হয়।

ECG কি?

ইসিজি রিপোর্ট বোঝার নিয়ম বা উপায়।

আমাদের স্নায়ু এবং পেশী কোষগুলি বৈদ্যুতিক এবং রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রিত হয় নিয়মিত বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে। এই সংকেত গুলো তৈরি করে হৃদপিন্ডের সাইনোট্রিয়াল নোড। সাইনোট্রিয়াল নোড হচ্ছে হৃদপিন্ডের ডান অলিন্দের একদল কোষ। এই বৈদ্যুতিক আবেগের ফলে প্রথমে হৃদপিন্ডের অ্যাট্রিয়া এবং এর পর ভেন্ট্রিকুল সংকুচিত হয় অর্থাৎ হৃদস্পন্দন হয়।

ECG এর পূর্ণ নাম হলো ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম। ইলেক্ট্রো কথাটির অর্থ ইলেক্ট্রিক অ্যাক্টিভিটি, কার্ডিও মানে হৃদপিন্ড এবং গ্রাম মানে ওয়েভ বা তরঙ্গ। হৃদস্পন্দনের কারণে যে বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি হয় তা যন্ত্রের মাধ্যমে গ্রাফ আকারে লিপিবদ্ধ করাই হলো ইসিজি। যে যন্ত্রের মাধ্যমে ইসিজি করা হয় তাকে ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফ বলা হয়। অর্থাৎ ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে ECG রিপোর্ট করা হয়।

ইসিজি কেন করা হয়?

বেশকিছু হৃদরোগ শনাক্ত করা যায় ইসিজি করে। রিপোর্ট থেকে জানা যায় হার্ট ঠিকমতো কাজ করছে কিনা। যেমন:

অ্যারিথমিয়াস বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হলে সেটা ইসিজি করে জানা যায়।

করোনারি আর্টারি ডিজিজ হলো এক ধরনের হৃদরোগ। করোনারি আর্টারি ডিজিজ হলে আর্টারি বা ধমনী সরু হয়ে যায়, যাকে আমরা হার্টব্লক বলি। এই রোগে বুকে ব্যথা হয় এমনকি হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। এই রোগ নির্ণয় করতে ডাক্তার এই টেস্ট করতে বলে।

আরো পড়ুন গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাম কখন ও কেন করবেন।

যদি পূর্ববর্তী হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকে বা হার্টে পেসমেকার বসানো থাকলে, ডিভাইসটি ঠিক মত কাজ করছে কিনা জানা যায়। এক কথায়, হার্ট স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কিনা তা বের করা যায় ইসিজি করে।

কখন ইসিজি করা প্রয়োজন

একজন ডাক্তার ফিজিক্যাল পরীক্ষার পর কতগুলো লক্ষণ ও উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারে। যেহেতু কার্ডিয়াক হেলথ জানার জন্য এই টেস্ট করা হয় এজন্য এই ব্যাপারটা খুব সেনসিটিভ। নিচের লক্ষণ গুলো দেখা দিলে এই মেডিকেল চেকআপ করার প্রয়োজন হয়।

  • বুকে ব্যথা, ‌ বুকের উপর প্রচন্ড চাপ থাকলে। মনে হবে বুকে কেউ চেপে ধরেছে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হবে
  • মাথা ঘোরানো সাথে হালকা মাথা ব্যাথা থাকলে
  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, হার্টবিট দ্রুত হলে
  • শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, ক্লান্তি বোধ, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা বা বুক ধড়ফড় করলে
  • উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের হার্টের অবস্থা জানার জন্য
  • হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকরা ইসিজি টেস্ট করার পরামর্শ দিতে পারে।

ইসিজি করার আগে করনীয়

এই টেস্ট করার আগে কোন বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। আপনি কোন ওষুধ সেবন করলে ইসিজি টেকনোলজিস্টকে এই ব্যাপারে জানাতে হবে। অনেক সময় ওষুধের প্রভাবে রিপোর্ট ভুল আসতে পারে।

১. টাইট ফিট ড্রেস পড়া যাবে না। ঢিলেঢালা ড্রেস পড়তে হবে।
২. শরীরে বেশি লোম থাকলে ইসিজি যন্ত্রের ইলেক্ট্রোডগুলি লাগাতে অসুবিধা হতে পারে। এজন্য শরীরের যে জায়গায় গুলোতে ইলেক্ট্রোডগুলি লাগাতে হবে সেখানকার লোমগুলো কেটে পরিষ্কার করার প্রয়োজন হতে পারে যাতে প্যাচগুলি ভালোভাবে লেগে থাকে।

৩.এই টেস্ট করার সময় ১২টি সেন্সর বাহুতে, পায়ে ও বুকে লাগানো হয়।  এই সেন্সর গুলোকে ইলেক্ট্রোড বলে। ইলেক্ট্রোড গুলো তারের এক প্রান্তে যুক্ত থাকে আর অপর প্রান্ত একটি মনিটরের সাথে যুক্ত থাকে।

৪.টেস্ট করার সময় স্থির ভাবে শুয়ে থাকতে হবে নড়াচড়া করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হবে। এই টেস্ট করতে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগে।

৫. টেস্ট করার সময় আপনার সাথে কোন ধাতব বস্তু রাখতে পারবেন না। যেমন: স্বর্ণ বা রুপার চেইন, গহনা, তামা রুপা লোহার তৈরি তাবিজ কবজ, কোমরের বেল ইত্যাদি।

ইসিজি রিপোর্ট বোঝার উপায়

একজন কার্ডিওলজিস্ট এই রিপোর্ট দেখে হার্টের বর্তমান কন্ডিশন বের করে ভালোভাবে আপনাকে বুঝিয়ে দিবে। ইসিজি রিপোর্ট সম্পর্কে আপনিও কিছু ধারণা নিতে পারবেন এই অনুচ্ছেদ থেকে, বুঝতে পারবেন রিপোর্টের অনেক অংশ। এই রিপোর্ট বুঝতে হলে আপনার কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা থাকতে হবে। যেমন:

হার্ট বিট বা হৃদস্পন্দন

সাধারণত নাড়ির গতি পরীক্ষা করে হৃদস্পন্দন জানা যায়। এক হাতের কবজিতে অন্য হাতের তর্জনী ও মধ্যাঙ্গুলী আলতো ভাবে রেখে প্রতি মিনিটে স্পন্দন বের করা যায়। তবে নাড়ি পরীক্ষা করে হৃদস্পন্দন একেবারে সঠিকভাবে বের করা বেশ মুশকিল বিশেষ করে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হলে।

টেস্ট করে একদম সঠিক হার্ট বিট নির্নয় করা যায়। রিপোর্টে অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হৃদস্পন্দন নির্দেশ করলে তাকে ট্যাকিকার্ডিয়া এবং অস্বাভাবিকভাবে ধীর হৃদস্পন্দন নির্দেশ করলে তাকে ব্র্যাডিকার্ডিয়া বলে।

প্রতি মিনিটে হার্টবিট ১০০ এর বেশি হলে ট্যাকিকার্ডিয়া বিবেচিত হয়। পরিশ্রম, ব্যায়াম, কোন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কারনে হতে পারে। বিশ্রাম অবস্থায় ট্যাকিকার্ডিয়া অসুস্থতা বা হৃদরোগের কারণেও হতে পারে।

প্রতি মিনিটে হার্টবিট ৬০ এর চাইতে কম হলে সেটা ব্র্যাডিকার্ডিয়া ধরা হয়। সাথে অন্য কোন উপসর্গ না থাকলে ব্র্যাডিকার্ডিয়াকে স্বাভাবিক ভাবেই নেয়া যায়। খেলোয়াড়, বয়স্ক, অনেক তরুণ ও স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিদের ব্র্যাডিকার্ডিয়া হতে দেখা যায়। সাধারণত প্রাপ্ত বয়স্কদের হার্টবিট ৬০ থেকে ১০০ থাকা স্বাভাবিক।

ECG ওয়েভ বা তরঙ্গ

ইসিজি রিপোর্ট বুঝতে হলে প্রথমে গ্রাফে নির্দেশিত তরঙ্গ গুলো সম্পর্কে বুঝতে হবে। চিত্রে উল্লেখিত P,Q,R,S ও T তরঙ্গ পাঁচটি হার্টের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি গুলোকে নির্দেশ করে। P হলো প্রথম তরঙ্গ যা অ্যাট্রিয়াল ডিপোলারাইজেশন বোঝায়। হৃদপিন্ডের উপরের দুটি প্রকোষ্ঠকে যথাক্রমে ডান ও বাম ডান অলিন্দ বলে। P তরঙ্গ অলিন্দের সংকোচনকে বোঝায়।

এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে অলিন্দের সংকোচন হয় কেন? সাইনোট্রিয়াল নোড (SA) বা হৃদপিন্ডের প্রাকৃতিক পেসমেকার ইলেকট্রিক সিগন্যাল অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড (AV) বা রিজার্ভ পেসমেকার এর মাধ্যমে সারা হৃদপিন্ডে ছড়িয়ে দেয়। ফলে অলিন্দের হৃদপেশী গুলো নরমাল অবস্থা থেকে ডিপোলারাইজ হয়, ফলে অলিন্দের সংকোচন হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় P ওয়েভ ০.১ সেকেন্ড সময়ে হয়।

QRS তরঙ্গ ভেন্ট্রিকুল বা নিলয়ের সংকোচনকে বোঝায়। স্বাভাবিক অবস্থায় যা সময় নেয় ০.৩ সেকেন্ড। T তরঙ্গ নিলয় দুটির ডিপোলারাইজেশন থেকে রিপোলারাইজেশন অর্থাৎ নিলয় দুটির শিথিল হওয়া অবস্থাকে নির্দেশ করে।

P তরঙ্গের নির্দেশনা

রিপোর্ট P তরঙ্গ বিদ্যমান থাকলে এবং এটি উলম্ব বরাবর বা খাড়া উপরের দিকে থাকলে সুস্থ হার্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ হার্টের অলিন্দ দুটির কার্যকারিতা ভালো থাকলে রিপোর্টে P তরঙ্গ খাড়াভাবে উপস্থিত থাকবে।

PR interval পরিমাপ

P তরঙ্গের শুরু থেকে QRS কমপ্লেক্স শুরু পর্যন্ত হলো PR interval। একটি সুস্থ স্বাভাবিক হার্টের PR ব্যবধান হল ১২০ থেকে ২০০ মিলি সেকেন্ড বা ০.১২ থেকে ০.২০ সেকেন্ড। PR interval কম বা বেশি হলে সেটা হার্টের অসুস্থতা নির্দেশ করে।

QRS কমপ্লেক্স পরিমাপ

QRS কমপ্লেক্সে এর স্বাভাবিক সময়ের ব্যবধান ০.০৮ থেকে ০.১০ সেকেন্ড বা ৮০ থেকে ১০০ মিলিসেকেন্ড। এই সময়কাল ০.১০ থেকে ০.১২ সেকেন্ডের মত হলেও স্বাভাবিক। তবে এর বেশি হলে সেটাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

স্বাভাবিক হার্টবিট জানার উপায়

রিপোর্টে প্রত্যেকটি R তরঙ্গ যদি সমান দূরত্বে থাকে তাহলে হৃদস্পন্দন নিয়মিত বা স্বাভাবিক বোঝায়। আর দূরত্ব সমান না হলে অস্বাভাবিক বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বোঝায়। প্রতি মিনিটে হার্টবিট বের করার জন্য, প্রথম ১০ সেকেন্ডে R তরঙ্গের সংখ্যাকে ৬ দিয়ে গুন করে বের করা যায়।
অর্থাৎ হার্টবিট রেট= ১০ সেকেন্ড R তরঙ্গের সংখ্যা × ৬

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *