আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা। আমাশয় থেকে সুস্থ হতে যা খাবেন।

আসলে প্রতিটি রোগের কিছু পথ্য থাকে। তেমনি আমাশয় রোগীদের জন্য বিশেষ কিছু খাবার রয়েছে। এই বিশেষ খাবার রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। আমাশয় রোগী কোন ধরনের খাবার খাবে আর কোনগুলো বাদ দিতে হবে এই পোস্টটি জানানো হয়েছে।‌ প্রিয় পাঠকগণ আমাশয় কি এবং কেন হয় এবিষয়ে জানা প্রয়োজন।

এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা নামের এক ধরনের পরজীবীর সংক্রমনের কারণে এই রোগ হয়। ঘন ঘন পেটে চাপ অনুভব করা এবং মলের সাথে মিউকাস আমাশয়ের প্রধান লক্ষণ। তাছাড়া যারা আইবিএস রোগে আক্রান্ত তারা দীর্ঘ মেয়াদি আমাশয়ে ভুগে। আমাশয়কে আইবিএস এর একটি উপসর্গ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে।

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা।

রক্ত আমাশয় হলে মলের সাথে রক্ত বের হয়। তাই পানিশূন্যতা এবং লবণের ঘাটতি ছাড়াও, আয়রনের ঘাটতি জনিত রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে। ব্যাকটেরিয়া পেটের সব জায়গাতে ছড়িয়ে পড়লে ম্যালাবসোর্পশনের কারণে পুষ্টিহীনতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাদা আমাশয় বা অ্যামিবিয়াসিস হলেও জীবাণু পেট থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রোগীর শরীর দুর্বল হতে থাকে। তাই প্রয়োজন সময় মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পদক্ষেপ গুলো হল-

  • ট্রিগারিং এজেন্ট বা জীবাণু অপসারণ
  • পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ
  • পুষ্টির ঘাটতি ঠেকাতে সাপ্লিমেন্ট
  • পূর্ণ বিশ্রাম

সহজে হজম হয় এবং তরল খাবার খাওয়া সবচেয়ে ভালো সমাধান। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মশলাদার, চর্বিযুক্ত এবং দুধ ও দুধ দিয়ে তৈরি সব খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যাবে না

আমাশয়, ডায়রিয়া, আইবিএস ও বদহজম জনিত পেটের সমস্যায় গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার গুলো নিরাপদ নয়। গম, রাই ও বার্লিতে গ্লুটেন থাকে। তাই এইসব দিয়ে তৈরি করা খাবার যেমন: রুটি, বিস্কিট, কেক ইত্যাদি খাওয়া যাবে না।

গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার আমাশয়ের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে পেটে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকে সহজ করে এবং সুস্থ হতে বাধা দেয়। তাই সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত নয়।

ল্যাকটোস খাবার খাওয়া যাবে না

দুধ, দই, পনির এবং দুধ থেকে তৈরি সব খাবার খাওয়া বাদ দিন। এইসব খাবারে প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। কিন্তু যাদের ল্যাকটোস ইনটলারেন্স রয়েছে তারা এইসকল খাবার খেলে পেটে সমস্যা হয়। আমাশয় হলে কখনো কখনো পেটে অস্থায়ী ল্যাকটোস ইনটলারেন্স সৃষ্টি হয়। তখন এই ধরনের খাবার খেলে পেটের অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পুষ্টির ঘাটতি রোধ করতে প্রাণিজ দুধের বিকল্প হিসেবে সয়া দুধ খেতে পারেন। সয়া দুধে ক্যালসিয়ামে, ভিটামিন ডি, রিবোফ্লাভিন ও আরও কিছু পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে যা আমাশয় রোগীদের জন্য নিরাপদ।

মশলাদার ও অতিরিক্ত তেল, চর্বি দিয়ে রান্না করা খাবার বাদ দিন

মরিচ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য মসলা ও তেল চর্বি দিয়ে রান্না করা খাবার কিছু দিন বন্ধ রাখুন। চিপস, ক্রোকেটস, প্যানকেকস, বার্গার, স্টেকস, মাছ, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদি খাবার বাদ দিন।

অল্প পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ

একটা মানুষের দৈনিক ৩০ গ্রাম ফাইবার খেতে হবে। শরীর সুস্থ রাখতে এটি একটি উপকারী উপাদান। কিন্তু আমাশয় অবস্থায় বেশি ফাইবার খেলে পেটে আরো কিছু নতুন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফাইবার অন্ত্র থেকে পানি শোষণ করে ফলে পানি শূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে ও হজমে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সাথে পেট ফাঁপা, গ্যাস্ট্রিক, পেটে ব্যথা ইত্যাদি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শাকসবজি, উদ্ভিদ বীজ, গমের আটা, বাদামী বা লাল চাল, কিছু ফল-মূলে ফাইবার বেশি থাকে।

আমাশয় হলে খাওয়া যাবে না যেসব খাবার সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শসা, পেঁয়াজ, কাঁচা রসুন ইত্যাদি উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার।
  • উচ্চ আঁশযুক্ত ফল। যেমন: আপেল, বরই, তরমুজ, নাশপাতি, আম,‌ নারকেল, পেয়ারা ইত্যাদি।
  • প্রাণিজ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার। গরুর দুধ, গরুর দুধের সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি।
  • বীজ বা দানাদার খাবার। যেমন: বাদাম, ছোলা বুট, শিমের বিচি, কুমড়া, কাঁঠাল, তিসি ইত্যাদি বীজ জাতীয় খাবার।
  • চিপস, চানাচুর, ফুচকা, বার্গার, এনার্জি ড্রিংকস সহ সব ধরনের জাঙ্কফুড।
  • গমের আটা, বার্লি, রাই দিয়ে তৈরি খাবার।

আমাশয় রোগীর উপকারী খাবার

আমাশয় রোগ দূষিত খাবার ও পানির কারনে সংক্রমণ ও বিস্তার ঘটে। তাই এই রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় করতে বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার গ্রহণ অপরিহার্য।

  • ল্যাকটোব্যাসিলি, বিফিডোব্যাকটেরিয়া এবং ইউব্যাকটেরিয়া হলো ভালো ব্যাকটেরিয়া। এরা পেটের খারাপ ব্যাকটেরিয়ার বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে। টক দই, বাটার মিল্ক, কেফিরতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। সয়া দুধ দিয়ে তৈরি টক দই হতে পারে আমাশয় নিরাময়ে একটি সহায়ক খাদ্য।
  • সাদা চালের ভাত বা ঝাউ ভাত একেবারে কম মসলা দিয়ে রান্না করা পেঁপে বা লাউ তরকারি দিয়ে খেলে উপকার পাবেন।
  • আমাশয় হলে খাওয়ার রুচি কমে যায় সাথে বমি বমি ভাব থাকতে পারে তাই পেট ভরে খাওয়ার পরিবর্তে একটু পর পর অল্প অল্প করে খাওয়ার চেষ্টা করুন।
  • কম ফাইবারযুক্ত ফল যেমন কমলা এবং ডালিমের রস খাওয়া যেতে পারেন।
  • পানি শূন্যতা প্রতিরোধে ডাবের পানি, খাবার স্যালাইন বেশি খাবেন।
  • লাউ, পেঁপে, গাজর ইত্যাদি কম ফাইবারযুক্ত সেদ্ধ তরকারি মোটামুটি নিরাপদ।
  • ডায়রিয়া ও আমাশয়ে খনিজ লবণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কলাতে পটাশিয়াম থাকে, পটাশিয়ামের অভাব পূরণে কলা খেলে উপকার পাওয়া যাবে।

আমাশয় সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নোত্তর

আমাশয় হলে কি ডিম খাওয়া যাবে?
ডিম সহ সব ধরনের আমিষ জাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো। আমিষ জাতীয় খাবার দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা যাবে না। একটু সুস্থ হলেই আমিষ খেতে পারবেন। আমাশয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রথমদিকে ডিম খাওয়া উচিত নয় কিন্তু একটু সুস্থ হলেই সেদ্ধ ডিম খেতে পারবেন।

আমাশয় হলে কি কলা খাওয়া যায়?
কলা আমাশয় রোগীর ভালো পথ্য। কাঁচা কলা খেলে পেটে চাপ কমে এবং মল শক্ত হয়।

আরো পড়ুন যক্ষ্মা রোগীর খাবার তালিকা।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *